ঢাকা শুক্রবার, ১০ই এপ্রিল ২০২০, ২৮শে চৈত্র ১৪২৬


নির্বাচনে জয় মুখ্য নয়, সকল শিক্ষার্থীর অংশীদারিত্ব চাই


২৩ জানুয়ারী ২০১৯ ১৮:৫৮

আপডেট:
১০ এপ্রিল ২০২০ ১৯:০২

নির্বাচনে জয় মুখ্য নয়, সকল শিক্ষার্থীর অংশীদারিত্ব চাই

‘ডাকসু নির্বাচনে বিজয়ী হওয়াটা কোন ছাত্র সংগঠনের মুখ্য উদ্দেশ্য হতে পারে না। আমি মনে করি ডাকসু নির্বাচন হওয়াটাই সকল ছাত্র সংগঠনের বিজয়, সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিজয়। নির্বাচনে বিজয়ী হওয়াটা গৌণ, সকল শিক্ষার্থীদের অংশীদারিত্বই মুখ্য বিষয়।’

দীর্ঘ ২৮ বছর পর আলোর মুখ দেখতে যাচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)। ইতিমধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ডাকসু নির্বাচনের লক্ষ্যে কাজ শুরু করেছে। পাশাপাশি ডাকসু নির্বাচনকে ঘিরে অন্যান্য ছাত্র সংগঠনও তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান সময়ের দেশের অন্যতম ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। ডাকসু নির্বাচনকে ঘিরে ছাত্রলীগের পরিকল্পনা ও উদ্যোগ নিয়ে কথা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেনের সঙ্গে। বাংলা ইনসাইডারের সঙ্গে আলাপচারিতার চুম্বক অংশ পাঠকদের জন্য তাঁর সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো। সাক্ষাৎকারটি নেন কাবিদুল ইসলাম রুদ্র।

২৮ বছর পর ডাকসু নির্বাচন হচ্ছে, বিষয়টিকে কিভাবে দেখছেন?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে গণতান্ত্রিক স্থবিরতা তৈরি হয়েছিল, রাজনৈতিক চর্চার যে বন্ধ্যাত্বের সৃষ্টি হয়েছিল সেখান থেকে জাগরণের দ্বার হিসেবে দেখছি এ নির্বাচনকে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র হিসেবে আমি মনে করি এই নির্বাচনটি হচ্ছে ঢাবির ঘুরে দাঁড়ানোর একটি আহ্বান। আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের গ্রহণ প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থীদের অংশীদারিত্ব প্রয়োজন। একাডেমিক ক্যালেন্ডার কেমন হবে, এক্সট্রা কারিকুলাম অ্যাক্টিভিটিজ কিভাবে পরিচালিত হবে, গবেষণার বিষয়গুলো কিভাবে নির্ধারিত হবে, শিক্ষার্থীরা কিভাবে মুক্তির চেতনায় অঙ্গিকারে নিজেদেরকে শাণিত করবে সে বিষয়গুলো ডাকসু নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমেই প্রতিধ্বনিত হওয়া সম্ভব। সে জায়গা থেকে আমরা ডাকসু নির্বাচনের উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। একাডেমিক ক্যালেন্ডারে যেমন শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার তারিখ উল্লেখ থাকে ঠিক তেমনিভাবে ডাকসু নির্বাচনের নির্দিষ্ট তারিখ উল্লেখ থাকবে সেটিই আমাদের প্রত্যাশা।

এতদিন ধরে ডাকসু নির্বাচন না হওয়ার কারণ হিসেবে কী দেখছেন?

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে সেতুবন্ধন রচনাকারী সংগঠন ডাকসু। এর নির্বাচন হওয়ার জন্য অনেকগুলো ধাপ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, সিনেট সিন্ডিকেট, ছাত্র সংগঠন, সাধারণ শিক্ষার্থীরা সেই ধাপগুলোর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ছাত্র রাজনীতিতে ডাকসুর প্রভাব অনেক বেশি। ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার ক্ষেত্রে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ’৯০ এর পর আর ডাকসু নির্বাচন হয়নি। ’৯১ তে বিএনপি ক্ষমতায় এসে ক্যাম্পাসে একক দখলের রাজনীতির ধারা শুরু করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে অগণতান্ত্রিক হয়ে উঠার সেটিই সূচনা। তারপরও এতদিন ডাকসু নির্বাচন না হওয়ার পিছে সকল রাজনৈতিক দলের দায় রয়েছে বলে আমি মনে করি। পাশাপাশি দায় রয়েছে শিক্ষকদেরও। ছাত্র সংগঠনগুলো আমাদের গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের জন্য কাজ করে, বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে প্রতিটা ক্ষেত্রেই ছাত্রদের লড়াকু ইতিহাস রয়েছে কিন্তু যাদের নিয়ে তারা রাজনীতি করে তাদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে পারেনি। এছাড়াও, ছাত্র সংগঠনগুলো ডাকসুর মাধ্যমে অতি রাজনীতি করতে চেয়েছে। এর ফলে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যহত হওয়ার আশঙ্খাও তৈরি হয়েছে অনেক সময়। ডাকসুর মাধ্যমে ছাত্র সংগঠনের মধ্যে যেন অতি রাজনীতি ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের যেন বিরাজনীতিকরণ না হয় তা এড়াতেই এতদিন ডাকসু নির্বাচন আলোর মুখ দেখেনি। ছাত্র আন্দোলনের একজন কর্মী হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দিতে পারিনি বলে আমার মনবেদনা আছে, আমি আমার সে ব্যর্থতা স্বীকার করি। এই ডাকসু নির্বাচনের মাধ্যমেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল শিক্ষার্থীসহ রাজনৈতিক কর্মীরা একটি দায়মুক্তির সুযোগ পেয়েছে।

আওয়ামী লীগ গত দুই মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা সত্তেও ডাকসু আলোর মুখ দেখেনি। কিন্তু কেন?

আমি বলবো এটা আমাদের ব্যর্থতা নয়, এটা আমাদের সীমাবদ্ধতা। গত ১০ বছরে ক্যাম্পাসে স্বাভাবিক পরিবেশ তৈরির প্রক্রিয়া বিরাজমান ছিল। কেননা অনেক ছাত্র সংগঠনই ইতিপূর্বে ছাত্র রাজনীতির মৌলিক শর্তগুলো লঙ্ঘন করেছে। এমন অনেক ছাত্র সংগঠন আছে যারা তাদের নেতৃত্ব অছাত্রদের হাতে তুলে দিয়েছে। অনেক ছাত্র সংগঠন আবার স্বাধীনতা বিরোধী চিন্তা চেতনায় বিশ্বাসী। অন্যদিকে বাম ছাত্র সংগঠনগুলো বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তাদের পার্টি অফিসও বানাতে চেয়েছে। মূলত এসব প্রতিকূলতা ছাপিয়ে সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যেই বিলম্ব হয়েছে।

ডাকসু নির্বাচনকে ঢাবি ছাত্রলীগের পরিকল্পনা কী?

আমাদের প্রথম চাওয়া ডাকসু নির্বাচনটা হোক। নির্বাচনের পরিবেশকে সুন্দর ও ফলপ্রসূ করার জন্য আমরা গঠনতন্ত্র কমিটির কাছে ইতিমধ্যেই আমাদের প্রতিবেদন উপস্থাপন করেছি। সেখানে আমরা বলেছি নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশের স্বার্থে আমরা সকল ছাড় দিতে প্রস্তুত রয়েছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়, বিশ্বের সর্বাধুনিক কেন্দ্রীয় লাইব্রেরী, সকল অযৌক্তিক বর্ধিত হল ফি ও পরীক্ষার ফি বাতিল, গণপরিবহনের সুব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ, ক্যান্টিনে পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা এসব প্রত্যাশা পূরণই ঢাবি ছাত্রলীগের পরিকল্পনা।

ছাত্রলীগ থেকে কারা নির্বাচন করবেন? সে ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত হয়েছে কি?

ছাত্রলীগের কর্মীদের কাছে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক, বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার কর্মী হওয়াটাই সবচেয়ে বড় পরিচয়, গর্বের। তবে দায়িত্বশীল জায়গা থেকে আমাদের চেষ্টা থাকবে, সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে গ্রহণযোগ্য, এখানকার মেধাবী ও তরুণদের নেতৃত্ব দিতে সক্ষম, একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মকাবেলা করতে সক্ষম তাদেরকেই আমরা ছাত্রলীগের মাধ্যমে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দেবো। কারা নির্বাচন করবে, কারা করবে না তা আমাদের কাছে একেবারেই গৌণ। আমাদের গণতান্ত্রিক ফোরাম রয়েছে, বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সিদ্ধান্ত রয়েছে, সেটির আলোকেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

অন্যান্য ছাত্র সংগঠন সহাবস্থানের দাবি জানাচ্ছে, এ ব্যাপারে আপনার মতামত কী?

আমি মনে করি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে পূর্ণ সহাবস্থান, পূর্ণ গণতান্ত্রিক পরিবেশ বিরাজ করছে। ক্যাম্পাসে ক্রিয়াশীল যে ১৪টি ছাত্র সংগঠন আছে, প্রত্যেকটি অবাধেই তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

অনেকেই অভিযোগ করেন, ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের একক আধিপত্য রয়েছে, এ ব্যাপারে কী বলবেন?

ঢাবির হলগুলোতে শিক্ষার্থীদের আধিপত্য রয়েছে। শিক্ষার্থীদের কাছে ছাত্রলীগের জনপ্রিয়তা রয়েছে, এটাই আমাদের আত্মতৃপ্তির বিষয়, অনুপ্রেরণার কারণ। ভালো কাজের মাধ্যমে ছাত্রলীগকে শুভবোধের প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হবে, এটিই আমাদের প্রত্যাশা।

ছাত্র ইউনিয়নের একজন শীর্ষ নেতা (লিটন নন্দী) দুইবার মাস্টার্স করা শিক্ষার্থী ও ইভেনিং শিক্ষার্থীদেরও ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির দাবি জানিয়েছেন। কীভাবে দেখছেন?

ছাত্রদের দাবি আদায়ে অতীতে তাদের লড়াকু ইতিহাস রয়েছে। এখনো তারা ছাত্রদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে লিপ্ত রয়েছে বলে আমি বিশ্বাস করি। তারা এমন কোন প্রস্তাব দিয়েছে কিনা তা আমার জানা নেই। তবে আমি মনে করি, যারা ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তাদের মধ্য থেকেই ছাত্রদের প্রতিনিধি আসা উচিৎ, বাকিটা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সিদ্ধান্ত।

ডাকসু নির্বাচনকে ঘিরে ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে কি কোন ইশতেহারের তৈরি হয়েছে? ইশতেহারে কী কী প্রাধান্য পাবে?

ছাত্রদের অধিকার আদায়ে ছাত্রলীগ সবসময় তৎপর। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কিছুদিন আগে ‘বি ইউনিট’ এর পরীক্ষা পুনরায় নেয়ার ক্ষেত্রে ছাত্রলীগের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। নির্বাচনী তফসিল এখনো ঘোষিত হয়নি। সেক্ষেত্রে নির্বাচনী আচরণবিধি মেনেই আমরা আমাদের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছি। পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়, বিশ্বের সর্বাধুনিক কেন্দ্রীয় লাইব্রেরী, সকল অযৌক্তিক বর্ধিত হল ফি ও পরীক্ষার ফি বাতিল, গণপরিবহনের সুব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ, ক্যান্টিনে পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা এগুলো আমাদের ইশতেহারে প্রাধান্য পাবে।

মুক্তিযুদ্ধ ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ডাকসু থেকে ছাত্রলীগের অনেক ক্যারিশমাটিক নেতৃত্ব বের হয়েছিল। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এমন নেতৃত্ব বের হওয়া কি সম্ভব?

ডাকসুর নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্র নেতারাই পরবর্তীতে জাতীয় রাজনীতিতে রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান। শুধুমাত্র ভিপি কিংবা জিএস না, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভোটে যারাই নির্বাচিত হবে তারা প্রত্যেকেই জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক ভূমিকা সংযোজন করার সক্ষমতা রাখে। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীরা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সাংস্কৃতিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ হবে, এটি আমাদের প্রত্যাশা। যে সাধারণ শিক্ষার্থী ভোট দিল, তার হয়তো কোন প্রাপ্তি হয়নি কিংবা ডাকসুর সঙ্গে কোন সাংগাঠনিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নয়, কিন্তু সে যে ভোটাধিকার প্রয়োগ করলো তাতেই তার নৈতিক জাগরণ হচ্ছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তোলার সংগ্রামে সেও নিয়োজিত হলো। আমি মনে করে ডাকসু নির্বাচনে এবার শুধুমাত্র ২২ জন শিক্ষার্থীই নির্বাচিত হবে না বরং ৩৬ হাজার শিক্ষার্থীর প্রাণের স্ফুরণ হবে। এটিই আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।বাংলা ইনসাইডার