ঢাকা মঙ্গলবার, ২৮শে জানুয়ারী ২০২০, ১৬ই মাঘ ১৪২৬


চালের দাম বাড়িয়েছে তিন ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট


১০ ডিসেম্বর ২০১৯ ১১:০৪

আপডেট:
২৮ জানুয়ারী ২০২০ ০৯:১৫

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের হঠাৎ দাম বৃদ্ধির জন্য বাজার পর্যবেক্ষণের দুর্বলতা ও অসাধু ব্যবসায়ী জোটকে (সিন্ডিকেট) দায়ী করেছেন গোয়েন্দারা। এ জোটের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশও করেছেন তারা। সম্প্রতি সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন পেশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে চাল, আটা, ময়দা, সয়াবিন তেল ও পেঁয়াজসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়ার প্রধান কারণ হিসেবে অসাধু ব্যবসায়ীদের জোটকে দায়ী ও বাজার মনিটরিংয়ের দুর্বলতাকে দায়ী করা হয়েছে।

বিশেষ করে চালের দাম বাড়ার জন্য সরকারদলীয় সমর্থক তিন ব্যবসায়ীর জোটের কথা বলা হয়েছে। আর পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধির জন্য ভারতে বন্যায় চাষাবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ও চাহিদা অনুযায়ী পেঁয়াজ আমদানি করতে না পারাকে উল্লেখ করা হয়।

প্রতিবেদনের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) সভাপতি ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রতিবেদনের যৌক্তিক বিষয়গুলো আমলে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টরা নিশ্চয়ই উপযুক্ত ব্যবস্থা নেবেন। এটা আমরা প্রত্যাশা করি। এ দেশে সবাই ব্যবসাবান্ধব। আমরা আশা করব, গোয়েন্দা প্রতিবেদনের যথার্থতা বিবেচনা করে ভোক্তাবান্ধব পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’

প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘চালের পর্যাপ্ত মজুদ থাকা সত্ত্বেও হঠাৎ দাম বাড়ার প্রধান কারণ খুচরা ব্যবসায়ী ও মিল মালিকদের স্বেচ্ছাচারিতা। অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের চালের দাম বাড়ার জন্য তিন মিল মালিকের সিন্ডিকেট দায়ী। তাদের একজন দেশের সর্ববৃহৎ মিল মালিক কুষ্টিয়ার আবদুর রশীদ।

তিনি একসময় বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত থাকলেও বর্তমানে আওয়ামী লীগের মতাদর্শী। আরেকজন নওগাঁর মিল বেলকন ইন্ডাস্ট্রিজের (রজনীগন্ধা মার্কা) মালিক বেলাল হোসেন। তিনি যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকে তার সঙ্গেই যুক্ত থাকেন। অন্য মিলমালিক চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি এরফান।

এ তিন ব্যবসায়ী জোট করে সুপরিকল্পিতভাবে ধানের মূল্য বাড়িয়েছেন। পরবর্তী সময়ে ধানের মূল্য বাড়ার অজুহাতে চালের দাম বাড়ানো হয়। এ তিন ব্যবসায়ী শুধু মিনিকেট চালের ক্ষেত্রে জোটবদ্ধ হয়ে অপকৌশলের আশ্রয় নেন। এ সুযোগে চালের পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতারা সব ধরনের চালের মূল্য বাড়িয়ে দেন।’

প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘বাংলাদেশে পেঁয়াজের বার্ষিক চাহিদা ২৪ লাখ মেট্রিক টনের বিপরীতে দেশে উৎপাদন হয় ১৭ লাখ মেট্রিক টন। প্রতি বছর প্রায় ৭ লাখ

মেট্রিক টন পেঁয়াজ আমদানি করতে হয়, যার বেশিরভাগ ভারত থেকে আনতে হয়। এ বছর ভারতে আকস্মিক বন্যায় পেঁয়াজ উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ভারত থেকে পর্যাপ্ত পেঁয়াজ আমদানি করা সম্ভব হয়নি। এমনকি পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য আগে থেকেই যথাযথ ও কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় পেঁয়াজের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে।’

প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণের জন্য পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে মনিটরিং অত্যন্ত দুর্বল। এ দুর্বল মনিটরিংয়ের সুযোগে অসাধু ব্যবসায়ীরা অধিক মুনাফার আশায় সিন্ডিকেট করে অব্যাহতভাবে বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়িয়েছে।

প্রতিবেদনের মতামত অংশে বলা হয়, ‘নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়সীমার মধ্যে রাখার জন্য সরকার গৃহীত পদক্ষেপগুলোকে গতিশীল করতে হবে। মিলমালিক, আড়তদার, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরা যাতে কোনোভাবেই জোট গঠন করতে না পারে সেদিকে প্রখর নিরীক্ষণ ও নজরদারি রাখতে হবে।’

সুপারিশে বলা হয়েছে, ‘অবিলম্বে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার কারণ শনাক্ত করে দাম বাড়ানোর জন্য দায়ী মিলমালিক, আড়তদার, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। উৎপাদক, পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে পণ্যের সুনির্দিষ্ট মূল্য নির্ধারণ করে দিতে হবে। পাশাপাশি বাজার নিয়ন্ত্রণে গঠিত উচ্চপর্যায়ের কমিটির কার্যক্রমকে আরও গতিশীল ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গতিশীল করতে হবে।

প্রতিবেদনের ভূমিকায় বলা হয়, স্বল্প সময়ের ব্যবধানে খুচরা বাজারে চিকন চালের দাম কেজিপ্রতি ৭-৮ ও মোটা চালের দাম কেজি প্রতি ৪-৫ টাকা বেড়েছে। আটা কেজিপ্রতি বেড়েছে ১-২ টাকা, খোলা ময়দা কেজিতে ৭-৮ টাকা বেড়েছে।

পাশাপাশি বেড়েছে সয়াবিন তেলের দাম। পেঁয়াজের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে সরকারের বাজার নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের ওপর নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। দাম অব্যাহত ও লাগামহীনভাবে বাড়তে থাকলে তা সরকার কর্তৃক বাজার মূল্য নিয়ন্ত্রণ ও পর্যবেক্ষণ সংক্রান্ত গৃহীত কার্যক্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। যা সামগ্রিকভাবে সরকারের জনপ্রিয়তার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (আইআইটি) মোছা. কামরুন্নাহার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা প্রতিবেদনে নির্দিষ্ট কোনো প্রস্তাব পেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব।’