ঢাকা মঙ্গলবার, ২৮শে জানুয়ারী ২০২০, ১৬ই মাঘ ১৪২৬


৪ ঘণ্টা কোথায় ছিলেন রুম্পা


১০ ডিসেম্বর ২০১৯ ১০:৫৭

আপডেট:
২৮ জানুয়ারী ২০২০ ১১:২৫

রাজধানীতে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী রুবাইয়াত শারমিন রুম্পার (২১) লাশ উদ্ধারের ছয়দিন পরও তার ‘অস্বাভাবিক মৃত্যুর’ রহস্য উদঘাটন হয়নি। তদন্তসংশ্লিষ্ট ও স্বজনদের ধারণা, এর নেপথ্যে রয়েছে প্রেমের সম্পর্কের টানাপড়েন। তবে এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড নাকি কারও প্ররোচনায় রুম্পা আত্মহত্যা করেছেন, এ বিষয়টি গতকাল সোমবার পর্যন্ত নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ। তারা বলছে, হত্যাকাণ্ড ধরে তদন্ত চললেও প্রকৃত কারণ উদঘাটনে আরও সময় লাগবে।

গত বুধবার রাতে রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরী এলাকা থেকে লাশ উদ্ধারের সময় রুম্পার পরিচয় জানা যায়নি। পরদিন স্বজনরা লাশ শনাক্ত করলে জানা যায় রুম্পা হবিগঞ্জে কর্মরত পুলিশ পরিদর্শক রোকনউদ্দিনের মেয়ে। স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির সিদ্ধেশ্বরী শাখার ইংরেজি দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী রুম্পা মা-ভাইয়ের সঙ্গে থাকতেন মালিবাগের একটি বাসায়। বিষয়টি রহস্যজনক মনে হওয়ায় একই দিন অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে রমনা থানায় হত্যা মামলা করে পুলিশ।

এরপর রুম্পা ‘হত্যার’ বিচার দাবিতে স্টামফোর্ডের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামে। এরই মধ্যে গত শনিবার রুম্পার সাবেক প্রেমিক আবদুর রহমান সৈকতকে (২২) জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গত রবিবার আদালতের মাধ্যমে চারদিনের রিমান্ডে নিয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে তারা।

এদিকে শেষবার বাসা থেকে বের হওয়া ও লাশ উদ্ধারের মাঝের প্রায় চার ঘণ্টা রুম্পা কোথায় ছিলেন, এ নিয়ে তদন্ত চলছে। ডিবির দক্ষিণ বিভাগের অতিরিক্ত

উপকমিশনার শামসুল আরেফিন  বলেন, ‘সৈকতকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ পেয়েছি। সেগুলো বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। ভিকটিম রুম্পার

ফোন আগেই জব্দ করেছি। সৈকতের ফোনও পেয়েছি। তাদের ফোন ফরেনসিক অ্যানালাইসিসের জন্য পাঠাব। বিশেষ করে তাদের ফেইসবুক মেসেঞ্জারে কথোপকথন পাওয়ার জন্য।’

তিনি আরও বলেন, ‘রুম্পাকে হত্যা করা হয়েছে না কি সে আত্মহত্যা করেছে এই বিষয়ে নিশ্চিত হতে আরও সময় লাগবে।’ কোন ভবন থেকে রুম্পা ‘নিচে পড়েছে’ জানতে চাইলে ওই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘আমার ধারণা ১২ তলা আয়েশা কমপ্লেক্স থেকেই সে পড়েছে।’

অন্যদিকে রুম্পার মরদেহের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন কবে প্রকাশ হবেÑ জানতে চাইলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিষয়টি স্পর্শকাতর হওয়াতে আমরা চেষ্টা করছি খুব দ্রুত প্রতিবেদন প্রকাশ করতে। আশা করছি আগামী ১৩ অথবা ১৪ ডিসেম্বর প্রতিবেদন প্রকাশ করতে পারব।’

তদন্তসংশ্লিষ্ট, রুম্পার স্বজন ও সহপাঠীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মরদেহ উদ্ধারের এক সপ্তাহ আগে থেকে সদা হাস্যোজ্জ্বল রুম্পা অনেকটা নিশ্চুপ হয়ে যান। ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়াও করতেন না। লাশ উদ্ধারের দিন বিকেলেও আয়েশা কমপ্লেক্সের সপ্তম তলায় বান্ধবী সুলতানার বাসায় গিয়েছিলেন রুম্পা।

সৈকতের সঙ্গে সম্পর্ক বিচ্ছেদ হওয়া নিয়ে তখনো কান্নাকাটি করেন তিনি। পরে সেখানে থেকে টিউশনির উদ্দেশে বের হন। টিউশনি শেষে সন্ধ্যা ৬টা ৩৫ মিনিটের দিকে বাসার নিচে যান। এরপর থেকে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত (লাশ উদ্ধারের আগে) রুম্পা কোথায় ছিলেন সে বিষয়টি তদন্ত করছে পুলিশ।

১২ তলা আয়েশা কমপ্লেক্সের পাশের গলি থেকে উদ্ধার হওয়া রুম্পার লাশ ঠাণ্ডা ছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ। ডিএমপির রমনা জোনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রুম্পার মরদেহ উদ্ধারের সময় তার শরীর ঠাণ্ডা ছিল। এ ছাড়া বহুতল ভবন থেকে কেউ নিচে পড়লে যতটা রক্তপাত হওয়ার কথা সেই তুলনায় অনেক কম রক্তপাত হয়েছে। তবে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে আয়েশা টাওয়ার থেকেই সে পড়েছে। ১২ তলা ভবনের ছাদে কোনো রেলিং নেই। ঝুঁকিপূর্ণভাবে সবাই ছাদে ওঠে। ওই ছাদে এর আগেও বান্ধবী সুলতানার সঙ্গে উঠেছিলেন রুম্পা।’

এ বিষয়ে জানতে মোবাইল ফোনে কল করলে রুম্পার বান্ধবী সিদ্ধেশ্বরী কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সুলতানা এ প্রতিবেদকের পরিচয় জানার পরই ফোনটি ভাই শাহিনকে ধরিয়ে দেন।

শাহিন  বলেন, ‘ঘটনার দিন বিকেলে রুম্পা আমাদের বাসায় এসেছিল। তবে সে তখন স্বাভাবিক ছিল, কোনো কান্নাকাটি করেনি। বাসা থেকে বের হওয়ার পর আর আসেনি। রুম্পার মরদেহ কোথায় পাওয়া গেছে, সে বিষয়টি আমাদের কারও জানা নেই।’

রুম্পার ঘনিষ্ঠজনরা বলছেন, ছয় মাস আগে সৈকতের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে রুম্পার। কিন্তু তিন মাসের মাথায় সম্পর্ক ছিন্ন করেন সৈকত। তিনি কারণ হিসেবে বলেন, বাবা ও চাচা মারা গেছে এজন্য সম্পর্ক রাখবেন না।

কিন্তু রুম্পা বিষয়টি মানতে পারেননি। রুম্পা গত তিন মাস বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেন সৈকতের সঙ্গে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে। কিন্তু সৈকতের মন গলেনি। একপর্যায়ে তার ফোন ধরাও বন্ধ করে দেন সৈকত।

ঘটনার দিন সকালে আয়েশা কমপ্লেক্সে বান্ধবীর বাসায় গিয়ে সৈকতের সঙ্গে দেখা করার ব্যবস্থা করে দিতে বলেন রুম্পা। সুলতানা তার বন্ধু মোমেনকে দিয়ে সৈকতকে ফোন করান। এরপর রুম্পা তার বান্ধবীকে সঙ্গে নিয়ে স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির সিদ্ধেশ্বরী শাখার সামনে যান। মোমেনের মাধ্যমে সৈকতকে ইউনিভার্সিটির সামনে ডেকে আনেন। সৈকত তখনো বলেন এই সম্পর্ক রাখা তার পক্ষে সম্ভব না।

এরপর রুম্পা সুলতানার বাসায় ফিরে আসেন। সেখানে প্রায় দেড়ঘণ্টা কান্নাকাটি করেন তিনি। পরে টিউশনির বাসা থেকে ফোন পেয়ে সাড়ে ৪টার দিকে পড়াতে যান। সেখান থেকে ৬টা ৩৫ মিনিটে রুম্পা নিজ বাসার নিচে যান। স্যান্ডেল, মোবাইল ফোন ও অন্যান্য জিনিস রেখে বাইরে আসেন। পরে রাত সাড়ে ১০টার দিকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

রুম্পা বাসার কাছেই ভিকারুননিসার তৃতীয় শ্রেণির এক ছাত্রীকে পড়াতেন। ঘটনার দিন বিকেলেও তাকে পড়াতে যান। ওই ছাত্রীর মা নুরুন্নাহার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত ৩ মাস আমার মেয়েকে পড়াচ্ছে রুম্পা। বিকেল ৪টা থেকে পড়ানোর কথা ছিল। কিন্তু আসতে দেরি করায় আমি ফোন করি। পরে ৪টা ৪০ মিনিটের দিকে পড়াতে আসে। আমি বাসার বাইরে ছিলাম এজন্য রুম্পার সঙ্গে দেখা হয়নি। ৫টা ৪৫-এর দিকে পড়িয়ে চলে যায় রুম্পা।

তিনি বলেন, রুম্পা হাসিখুশি থাকে সব সময়। তবে গত এক সপ্তাহ মন খারাপ করে থাকত। কম সময় পড়াত। মঙ্গলবার রুম্পার প্রিয় খাবার ফালুদা দিলেও সে খায়নি, বলেছে গলাব্যথা।