ঢাকা শুক্রবার, ১০ই এপ্রিল ২০২০, ২৮শে চৈত্র ১৪২৬


৩য়-৪র্থ শ্রেণির নিয়োগের কাজ করতে রাজি নয় পিএসসি


৬ ডিসেম্বর ২০১৯ ১৭:২৮

আপডেট:
৬ ডিসেম্বর ২০১৯ ১৭:৫৭

সরকারি বেতন কাঠামোর ১৩ থেকে ২০তম গ্রেডের (আগের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণি) শূন্যপদে নিয়োগের সুপারিশ করার দায়িত্ব নিতে রাজি নয় পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি)।

তবে সরাসরি না বলে দেওয়ার পরিবর্তে এসব পদে নিয়োগের সুপারিশ করার দায়িত্ব নিলে যে জটিলতার সৃষ্টি হতে পারে তা সরকারের কাছে তুলে ধরবে সংস্থাটি।

এসব শূন্যপদ পূরণের দায়িত্ব নেওয়ার পথে যেসব আইনি বাধা রয়েছে সেগুলো খতিয়ে দেখার জন্য একটি কমিটি গঠন করেছে পিএসসি।

একটি অনুবিভাগ করে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির বিভিন্ন পদে নিয়োগ দেওয়া হলে কতটা জনবল দরকার, সম্ভাব্য বাজেট কত হবে, অবকাঠামোগত সুবিধায় কী কী পরিবর্তন আনতে হবে তাও যাচাই-বাছাই করছে ওই কমিটি।


সার্বিক বিষয়ে এ কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কাছে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করবে সাংবিধানিক এ সংস্থা


এর আগে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় পিএসসিকে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির শূন্যপদ পূরণের জন্য প্রার্থী বাছাইয়ের প্রস্তাব দেয়।

অর্থ মন্ত্রণালয় এর আগে ১৩ থেকে ২০তম গ্রেডের বিভিন্ন পদে জনবল নিয়োগে বিভিন্ন বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয় বা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করে। একই সঙ্গে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে সরকারি

কর্মচারী নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কোনো বরাদ্দ রাখা যাবে না বলেও সিদ্ধান্ত দেয় অর্থ মন্ত্রণালয়।

আইন ও বিভিন্ন বিধি অনুযায়ী পিএসসি শুধু প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির বিভিন্ন পদে প্রার্থী বাছাই করে। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির বিভিন্ন শূন্যপদ পূরণ করে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ বা অধিদপ্তর।

কিন্তু এসব নিয়োগ নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় অনেক প্রতিষ্ঠান নিজেরা নিয়োগ প্রক্রিয়ায় না গিয়ে তৃতীয় কোনো প্রতিষ্ঠান, সংস্থা বা বিশ^বিদ্যালয়কে প্রার্থী বাছাইয়ের দায়িত্ব দেয়।

এ কাজে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের কয়েকটি অনুষদ সুনাম কুড়ালে আরও কয়েকটি পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ^বিদ্যালয় এ কাজে প্রতিযোগিতায় নামে।

একপর্যায়ে সরকার সিদ্ধান্ত নেয় বিশ^বিদ্যালয়গুলোর কাজ পড়াশোনা করানো, চাকরির প্রার্থী বাছাই করা তাদের কাজ নয়। এ চিন্তা থেকেই তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির শূন্যপদে আউটসোর্সিং বন্ধ করে অর্থ মন্ত্রণালয়।

এরপরই অর্থ মন্ত্রণারয় থেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব দেওয়া হয় পিএসসির কাঁধে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির প্রার্থী বাছাইয়ের দায়িত্ব চাপানোর।
পিএসসির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাদিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা বিষয়টি নিয়ে ভাবছি। একটি কমিটি করেছি। কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের জানানো হবে। ’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পিএসসির এক সদস্য  জানান, সরকার চাইলে আমাদের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির চাকরির প্রার্থী বাছাই করতে হবে।

সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হলেও আমরা সরকারের ওপর নির্ভরশীল। এটা হচ্ছে সর্বশেষ কথা। তার আগে আমাদের অনেক কিছু করার আছে। এসব পদে নিয়োগ দিতে হলে পিএসসি পরামর্শ গ্রহণ বিধিমালা, ১০৭৯’সহ আরও কয়েকটি আইন পরিবর্তন করতে হবে।

আমরা সরকারকে বোঝানোর চেষ্টা করব পিএসসি গঠন করা হয়েছে একটি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান হিসেবে। প্রজাতন্ত্রের গেজেটেড অর্থাৎ প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির পদে নিয়োগ দেওয়ার সুপারিশ করার জন্য।

বিভিন্ন সংস্থা নিয়োগ দিলে সেখানে দুর্নীতির ভয়। এ কারণে সরকার এর দায়িত্ব আমাদের ওপর চাপিয়ে দিতে চাচ্ছে। দুর্নীতির অভিযোগ তো ওইসব প্রতিষ্ঠানের অন্যসব কাজ নিয়েও হচ্ছে।

তাহলে সরকার কি সেসব কাজের দায়িত্ব পিএসসিকে দেবে? কেনাকাটায় দুর্নীতির খবর প্রায় প্রতিদিনই গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। তাহলে কি কেনাকাটার দায়িত্বও আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে? শুধু মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে অনেক পরীক্ষা নেওয়া হয়। সেসব পরীক্ষায় পিএসসিকে জড়িত করার কোনো মানে নেই


এদিকে সরকারের প্রায় সাড়ে তিন লাখ শূন্যপদ রয়েছে। শূন্যপদে নিয়োগ দিতে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও তা সফল হয়নি।

২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শুধু শিক্ষক নিয়োগের জন্য আলাদা একটি পিএসসি করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর সেই উদ্যোগ আটকে দিয়েছিলেন সরকারি কর্মকর্তারা।

তারা বিভিন্ন কমিটি করে বিষয়টি ঝুলিয়ে দিয়েছিলেন। অথচ সংবিধানেও রয়েছে প্রয়োজনে একাধিক পিএসসি করার বিষয়টি। এ অবস্থায় আলাদা পিএসসি না করে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির শূন্যপদের প্রার্থী বাছাইয়ের দায়িত্ব বর্তমান পিএসসির ওপরই চাপানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

স্বাধীনতার পরপর দুটি পিএসসি ছিল। একটি গেজেটেড কর্মকর্তাদের নিয়োগের সুপারিশ করত। অন্যটি নন-গেজেটেড কর্মকর্তাদের। কিন্তু কখনই চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের নিয়োগের সুপারিশ পিএসসি করেনি। অনেক সময় বিশেষ কোনো পদকে তাদের এখতিয়ারের বাইরে রাখা হয়েছে।

যেমন পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর পদটি দ্বিতীয় শ্রেণির গেজেটেড হলেও এদের নিয়োগ পুলিশ সদর দপ্তর থেকেই করা হয়, পিএসসি থেকে নয়।

সরকারের একটি অংশ চাচ্ছে বর্তমান পিএসসির ওপরই তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির নিয়োগের সুপারিশের দায়িত্ব চাপিয়ে দিতে। তারা একটি অনুবিভাগ করার পাশাপাশি পিএসসিতে আরও কয়েকজন সদস্য বাড়িয়ে দেওয়া পক্ষে।

সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার  বলেন, ‘পিএসসিকে এ দায়িত্ব দেওয়ার আগে ব্যাপকভাবে পর্যালোচনা করা দরকার।

যুগ যুগ ধরে যে দায়িত্ব নির্বাহী বিভাগ করে আসছে তা পিএসসির ওপর চাপাতে হবে কেন? এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিলে তা পিএসসির কর্মকা-কে জটিল করে তোলা হবে।

অপ্রয়োজনীয় কাজে পিএসসিকে ভারাক্রান্ত করা ঠিক হবে না। এখনই এক বছরের বিসিএস শেষ হয় আড়াই থেকে তিন বছরে। নতুন দায়িত্ব দিলে সেটা আরও বাড়বে বলে মনে হয়। ’

জনপ্রশাসনের এক কর্মকর্তা  জানান, প্রতিটি মন্ত্রণালয় কর্মকর্তাদের আর্থিক ক্ষমতার দায়িত্ব ভাগাভাগি করে দিয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে কোন কর্মকর্তা কোন কাজ করবেন। সে অনুযায়ী চতুর্থ শ্রেণির একজন পিয়ন নিয়োগ দেবেন উপসচিব পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা। সেই কাজটি বর্তমানে করেন সচিবরা। একটি নিয়োগ মানেই উৎকোচ।

লাখ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে চাকরি পেতে হয়। এজন্য উপসচিবের দায়িত্ব চলে গেছে যুগ্ম সচিব, অতিরিক্ত সচিব ডিঙ্গিয়ে সচিবের কাছে। কাজেই উপসচিবের কাজ যদি সাংবিধানিক সংস্থা পিএসসিকে দিয়ে করাতে হয় তাহলে আর কিছু অবশিষ্ট থাকে না।

হাজার কোটি টাকার বিদ্যুৎকেন্দ্র করতে পারে বিদ্যুৎ বিভাগ।

কিন্তু তারা পিয়ন নিয়োগ দিতে পারবে না। পিয়ন নিয়োগ দেওয়ার জন্য পিএসসির কাছে যেতে হবে।

এটা জাতি হিসেবে আমরা কতটা বিশৃঙ্খল তা প্রমাণ করে। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির পদে নিয়োগ দেওয়ার কাজ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ, সংস্থা, অধিদপ্তর ও পরিদপ্তরের নিজেদের করা উচিত। কিছুদিন আগেও তাই হয়েছে। এতে অবাঞ্ছিত তদবির হয়, চলে নিয়োগবাণিজ্যও। কিন্তু রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে এসব চাপ উপেক্ষা করা সম্ভব।