ঢাকা মঙ্গলবার, ১০ই ডিসেম্বর ২০১৯, ২৭শে অগ্রহায়ণ ১৪২৬


ঝুট ব্যবসা, জমি দখল, ফুটপাতের চাঁদাবাজি সবই তার নিয়ন্ত্রনে,

‘ঝুট বাপ্পি’র ত্রাসের রাজত্ব পল্লবীতে


২১ নভেম্বর ২০১৯ ০৪:৩৩

আপডেট:
১০ ডিসেম্বর ২০১৯ ১৬:৩৫

বলা হয়, কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চৌকাঠ মাড়াননি তিনি। করেছেন লেগুনা স্ট্যান্ডের লাইনম্যান ও চাঁদা আদায়কারীর কাজ। তবে রাজনীতির ছত্রছায়ায় গত ৮-১০ বছরে ঘুরে গেছে তার জীবনের চাকা। সড়কের ধুলাবালির মলিন জীবন যার নিত্যদিনের সঙ্গী ছিল তিনিই এখন ‘রাজার হালে’ জীবনযাপন করছেন। আলিশান বাড়ি, একাধিক পোশাক কারখানা, বিলাসবহুল গাড়ি, নামে-বেনামে কমপক্ষে ২০টি প্লট-ফ্ল্যাট ও নিজের জমিতে মার্কেট, অটো ব্রিকফিল্ডসহ গড়েছেন

সম্পদের পাহাড়। এসব তথ্য পাওয়া গেছে ঢাকা মহানগর (উত্তর) যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক তাজুল ইসলাম বাপ্পি ওরফে ‘ঝুট বাপ্পির’ নামে।

অভিযোগ আছে, রাস্তা থেকে উঠে এসে ‘রাজা’ বনে যাওয়া বাপ্পি সবই করেছেন সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানার জমি দখল, পরিবহনে চাঁদাবাজি এবং গার্মেন্ট ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে ঝুট ব্যবসার মাধ্যমে। রাজনীতির ছত্রছায়ায় প্রশাসনের চোখের সামনে এমন বেপরোয়াভাবে বেড়ে ওঠা বাপ্পির বিরুদ্ধে টু-শব্দ করার সাহস নেই কারও। অবশ্য গত ১৮ নভেম্বর তার সম্পদের হিসাব তলব করে বাংলাদেশ ব্যাংকে চিঠি দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সাত-আট বছর আগে ওয়ার্ড রাজনীতি ও পরে পল্লবী থানা যুবলীগের পদটি পেয়ে ভাগ্যের চাকা বদলে নেন বাপ্পি। ঢাকা-১৬ আসনের সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেতা ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহর আশীর্বাদ পেয়ে লেগুনার লাইনম্যান বাপ্পি এখন চলেন নিজস্ব গাড়িবহর নিয়ে। স্থানীয় নেতাকর্মীদের মুখে মুখে চাউর আছে, যুবলীগের অব্যাহতি পাওয়া চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীকে বিপুল পরিমাণ অর্থ দিয়ে কয়েক মাস আগে ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদকের পদটি বাগিয়ে নেন বাপ্পি।

পল্লবীতে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা ‘ঝুট বাপ্পি’ কিছুদিন আগেও লাইসেন্স করা অস্ত্র আর নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনী নিয়ে এলাকায় মহড়া দিয়েছেন। তবে শুদ্ধি অভিযান শুরুর পর অনেকটা গা ঢাকা দিয়েছেন তিনি।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, বাপ্পি বছর দশেক আগে মিরপুরের আরামবাগ থেকে পূরবী সিনেমা হল পর্যন্ত যেসব লেগুনা চলাচল করত, তা সারি সারি করে রাখা ও সিরিয়াল ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করতেন। সেই সঙ্গে স্থানীয় রাজনীতিবিদদের হয়ে এসব পরিবহন থেকে চাঁদা তোলার কাজটি করতেন। এর আগে ২০০৫-০৬ সালের দিকে যুবলীগের স্থানীয় রাজনীতিতে যুক্ত হন। ২০১২ সালের ২২ জুলাই পল্লবী থানাধীন সাবেক ৯২ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক হন। এরপরই মূলত বাপ্পি পল্লবী এলাকার গার্মেন্টসের ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করেন। ২০১৪ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি পল্লবী থানা যুবলীগের সভাপতির পদটি পেয়ে যান। এ পদ পাওয়ার পর শৈশব থেকেই বেপরোয়া বাপ্পির নিয়ন্ত্রণে চলে আসে ঝুট ব্যবসা, পরিবহনে চাঁদাবাজি, ফুটপাত দখল করে দোকান বসিয়ে চাঁদাবাজি আর সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানার কমপক্ষে দুই ডজন প্লটও। যুবলীগ নেতার তকমা লাগিয়ে অল্প সময়েই ৩০০-৪০০ কোটি টাকার মালিক হয়ে যান। পরিবারে বেশ কয়েকটি গাড়ি থাকলে বাপ্পি চলাচল করেন মূলত হ্যারিয়ার (ঢাকা মেট্রো-গ ১৫-৩৪৫৪) মডেলের একটি গাড়িতে, যার মূল্য প্রায় ৬৫ লাখ টাকা।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাপ্পির বাবা ‘ঝুট মন্টু’ও পল্লবী এলাকার ত্রাস ছিলেন। ওই অঞ্চলে গড়ে ওঠা তৈরি পোশাক কারখানা থেকে প্রতি মাসে যে ঝুট বের হতো তা থেকে নিয়মিত চাঁদা নিতেন তিনি। ঝুট ব্যবসার দ্বন্দ্বে শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদত বাহিনীর হাতে ২০০৬ সালের দিকে নিহত হন ‘ঝুট মন্টু’। বাবার মৃত্যুর পর পল্লবী এলাকায় পুরোদমে ঝুট ব্যবসায় নেমে পড়েন বাপ্পি। বাবার নামের সঙ্গে থাকা ‘ঝুট’ শব্দটি যুক্ত হয়ে বাপ্পি হয়ে যান ‘ঝুট বাপ্পি’। বর্তমানে পল্লবী এলাকার তৈরি পোশাক কারখানাগুলোর প্রায় সবকটিরই ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ তার হাতে। এর মধ্যে আলানা গ্রুপ, ইপিলিয়ান গ্রুপ, ইমা ক্লথ, ডেকো গ্রুপ, মারডিজাইন-২০০০, আজমত গ্রুপ মিলে কমপক্ষে ২০টি প্রতিষ্ঠানের ঝুট ব্যবসায় তার একক নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। এসব কার্যক্রমের জন্য তার রয়েছে নিজম্ব বাহিনী। যুবলীগের ইকবাল, ইমন, কানাপট্টির সোহাগ, সাগর ও সোহেল ওই বাহিনীর অন্যতম।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঝুট ব্যবসার পাশাপাশি সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানা প্লটের ওপর রয়েছে বাপ্পির নজর। গত পাঁচ-সাত বছরে পল্লবী এলাকার অনেক প্লটের দখল নিয়েছেন। তিনি প্রথমে ৭ নম্বর সেকশনের মিল্ক ভিটা রোডের মোড়ে ৩৩/জে নম্বরে ১০ কাঠার প্লটটি দখল নেন। এ প্লটটি সাবেক এক সরকারি কর্মকর্তার। বর্তমানে ৭ নম্বর সেকশনের ৩ নম্বর লাইনের অন্ধ গলিতে বাপ্পির রয়েছে জোড়া দুটি প্লট। সেখানে তার গাড়িচালক পলাশ বসবাস করেন। একই এলাকার ৫ নম্বর লাইনের ৫৩৯ নম্বর প্লট, ৬ নম্বর লাইনের ৩৩৯ নম্বর প্লট, অ্যাভিনিউ-৫-এর মোড়ের টিনশেড দোতলা বাড়িটিও বাপ্পির। এছাড়া আজমত উল্লাহ গার্মেন্টসের পাশে একটি প্লট দখল করেছেন তিনি, যা তার লোক হিসেবে পরিচিত ভাঙ্গারি সোহেলের কাছে ভাড়া দেওয়া আছে। বাপ্পির নিজের নামে যত সম্পদ আছে তার চেয়ে অনেক বেশি সম্পদ রয়েছে তার একাধিক স্ত্রীর নামে। আশুলিয়া, বেড়িবাঁধ, ইস্টার্ন হাউজিং, আবদুল্লাপুর, মিরপুর ১০ নম্বরের কমিশনার গলি, ১২ নম্বর ডি-ব্লক ও সেনানিবাস এলাকায় রয়েছে তার একাধিক প্লট ও ফ্ল্যাট।

স্থানীয়রা জানান, জন্মসূত্রে বরিশালের ছেলে হলেও আত্মীয়তা সূত্রে বাগেরহাটকেই নিজ জেলা বলে দাবি করেন বাপ্পি। বাগেরহাটে বিশাল চিংড়ির ঘের রয়েছে তার। অর্ধশত কোটি টাকা ব্যয়ে সেখানে করেছেন একটি অটো ব্রিকফিল্ড; জিকে অটো ব্রিকফ্রিল্ড নামের ওই ইটভাটায় এনেছেন উন্নত দেশের প্রায় ৩০ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি। এছাড়া গাজীপুরে বাপ্পির রয়েছে একটি টাইলস কোম্পানি। এতকিছুর পরও প্রথম জীবনের পরিবহন আর ফুটপাতের চাঁদাবাজি ছাড়েননি তিনি। পল্লবী এলাকার সিএনজি স্টেশন আর ফুটপাত থেকে মাসে কয়েক কোটি টাকা আদায় করেন লোক দিয়ে। এরই মধ্যে গত ২০ সেপ্টেম্বর ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক পদটি বাগিয়ে নেন বাপ্পি। অভিযোগ আছে, যুবলীগের তৎকালীন চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীর ক্যাশিয়ার হিসেবে পরিচিত দপ্তর সম্পাদক কাজী আনিসকে ৫০ লাখ টাকা দিয়ে বাপ্পি ওই পদ পান। মতিঝিলের আলোচিত মিল্কী হত্যাকা-ের পর দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান মহানগর উত্তর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এনায়েত কবির চঞ্চল। পরে চঞ্চলকে যুবলীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়। চঞ্চলের ওই শূন্যপদ পেতে সক্রিয় অনেক সাবেক ছাত্রনেতা চেষ্টা করে গেলেও অনেকটা ছোঁ মেরে তা নিয়ে যান বাপ্পি।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বাপ্পি বলেন, ‘পল্লবী মিল্ক ভিটা মোড়ের প্লটটি আমার কিনে নেওয়া। সব মিলিয়ে পল্লবী এলাকায় চারটি বাড়ি আছে। এর বেশি আমার কিছু নেই।’ তিনি বলেন, ‘ঝুট ব্যবসা আমার বাবা করত। সেই সূত্রেই আমি করি। আমি একা নই, ছাত্রলীগ, যুবলীগের বহু নেতা এ ব্যবসা জড়িত। ফুটপাত বা পরিবহন থেকে আমি এক টাকাও চাঁদা নিই না। বরং এগুলো বন্ধ করার জন্য দুবার থানায় জিডি করেছি।’ বাগেরহাটের ব্রিকফিল্ডের মালিকানা স্বীকার করে বাপ্পি বলেন, ‘এটি আমি কিনে নিয়েছি। তিন বছর ব্যবসা করে মালিকের কাছ থেকে ধীরে ধীরে কিনে নিই। সব মিলিয়ে আমার সম্পদ ২-৩ কোটি টাকার বেশি নয়।’