ঢাকা বৃহঃস্পতিবার, ২১শে নভেম্বর ২০১৯, ৮ই অগ্রহায়ণ ১৪২৬


সড়ক আইন প্রয়োগ নিয়ে ৩ রকম কথা


৫ নভেম্বর ২০১৯ ০২:৫৫

আপডেট:
২১ নভেম্বর ২০১৯ ২৩:৩২

বহুল আলোচিত সড়ক পরিবহন আইন বাস্তবায়ন নিয়ে লেজেগোবরে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। যারা আইনটি প্রয়োগ করবেন, ট্রাফিক পুলিশের অনেকেই এখনো আইনটি সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত নন। এ আইনের বিধিবিধান সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা নেই বেশিরভাগ চালক-পথচারীরও। আইনের বিধিমালা না থাকায় আইন প্রয়োগের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন পরিবহন মালিক ও শ্রমিক নেতারাও। কার্যকরের আগে আইনটি নিয়ে কোনো ধরনের প্রচার চালায়নি সরকারের সংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষই।

বিশেষ করে সড়কে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ট্রাফিক পুলিশও তাদের প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে পারেনি। এখনো আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করার কোনো ব্যবস্থা তাদের হাতে নেই। নতুন আইনের সঙ্গে সংগতি রেখে নতুন পজ মেশিনের (ডিজিটাল মামলা করার যন্ত্র) ওয়েবসাইট ডেভেলপ না হওয়ার বিদ্যমান পজ মেশিনে মামলা দিতে পারছেন না তারা। ট্রাফিক পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, আরও এক মাস সময় লাগবে ওয়েবসাইট ডেভেলপ করতে। সাময়িকভাবে কাগজের সিøপে মামলা দেওয়ার প্রস্তুতি নিলেও গতকাল পর্যন্ত সে সিøপও পৌঁছেনি মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছে।

ফলে গত ১ নভেম্বর থেকে সরকার আইনটি কার্যকরের তারিখ নির্ধারণ করলেও গতকাল সোমবার পর্যন্ত তা সড়কে প্রয়োগ হতে দেখা যায়নি। এমনকি কবে নাগাদ আইনটির পূর্ণ বাস্তবায়ন শুরু হবে, তাও স্পষ্ট করে বলতে পারছেন না আইনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষই। অথচ ১ নভেম্বর থেকেই এ আইনকে ঘিরে বেশ দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। বিশেষ করে রাজধানীতে ভীষণ বিপাকে পড়েছে সাধারণ যাত্রীরা। নতুন আইন কার্যকরের ঘোষণা আসায় রাজধানীতে ত্রুটিপূর্ণ কাগজ নিয়ে কোনো গাড়ি নামছে না। বিশেষ করে অ্যাপসভিত্তিক রাইড শেয়ারিংয়ের মোটরসাইকেল কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে। ফলে গণপরিবহনের সংকট দেখা দিয়েছে বিভিন্ন সড়কে।

আইন প্রয়োগ নিয়ে গতকালও সরকারের বিভিন্ন বিভাগ একেক ধরনের কথা বলেছে। এর আগে সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গত শনিবার আইন প্রয়োগের দ্বিতীয় দিন সাংবাদিকদের জানান, আগামী সাত দিন প্রচার চালানো হবে। এ সময় কোনো মামলা না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সে হিসেবে আগামী বৃহস্পতিবার থেকে আইনটি পুরোপুরি বাস্তবায়ন হওয়ার কথা।

আবার বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্র্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) চেয়ারম্যান ড. কামরুল আহসান গতকাল  বলেন, এ সপ্তাহ পর আইনটির আইনগত দিকগুলো বাস্তবায়ন করতে পারব।

আগামী সপ্তাহ থেকে নতুন সড়ক পরিবহন আইনের প্রয়োগ করা হবে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম। গতকাল ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘এ আইনটি প্রয়োগের আগে আমরা কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। আগামী সপ্তাহ থেকে সড়ক পরিবহন আইন প্রয়োগ করা হবে।’

এর আগে গত রবিবার ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মফিজউদ্দিন আহম্মেদ দেশ রূপান্তরকে বলেছিলেন, ‘নতুন আইনের প্রয়োগ সোমবার (গতকাল) থেকে শুরু হবে। মামলার জন্য সিøপ তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু সেটাও হয়নি।

এদিকে আইনকে সাধুবাদ জানালেও বিধিমালা তৈরির আগে আইন প্রয়োগের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন পরিবহন মালিক ও শ্রমিক নেতারা। সরকারের সাবেক নৌপরিবহনমন্ত্রী ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের বর্তমান কার্যকরী সভাপতি শাজাহান খান এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ দুজনই বিধিমালা প্রণয়ন করে আইন কার্যকরের প্রস্তাব দিয়েছেন। তারা প্রশ্ন তুলেছেন, বিধি প্রণয়ন ব্যতীত আইন প্রয়োগে জটিলতার অবসান হবে কীভাবে? তারা বলেছেন, এখনো সময় আছে। আইনটি নমনীয় করা হলে, তা বেশি কার্যকর হবে।

গত বছর সড়ক পরিবহন আইন পাস হয়। ১ নভেম্বর থেকে আইনটি কার্যকরের জন্য গত ২৮ অক্টোবর প্রজ্ঞাপন জারি করে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব মো. নজরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত আদেশে বলা হয়, সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ এর ধারা ১ এর উপ-ধারা (২) এ দেওয়া ক্ষমতাবলে সরকার ১ নভেম্বর তারিখকে আইন কার্যকর হওয়ার তারিখ নির্ধারণ করল।

নতুন আইনের বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বলেন, আমরা নতুন এ আইনকে স্বাগত জানাই। যেগুলো এখন বাস্তবায়ন করা সম্ভব সেগুলো বাস্তবায়ন করুক। আমাদের সহযোগিতা থাকবে। আমরা প্রতিদিনই প্রচার চালাচ্ছি। যাদের কাগজপত্র ঠিক নয়, এর দায়দায়িত্ব তাদের। এ বিষয়ে আমাদের কিছু করার নেই। তাদের সহযোগিতা করারও কোনো সুযোগ নাই। তারা যদি মামলা খাওয়ার ভয়ে না চালায় তবে কী করার আছে।

কাগজপত্র ঠিক করার জন্য সমিতির পক্ষ থেকে কোনো নির্দেশনা আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা সারা দেশে বহু সার্কুলার দিচ্ছি। প্রতিদিনই মিটিং করছি। আইনের বিষয়ে লিফলেট দিচ্ছি। কোন কোন ধারায় মামলা হবে তাও জানিয়ে দিচ্ছি। আমাদের পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রচার আগে থেকেই করা হচ্ছে।

দেশব্যাপী নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে সরকার ২০১৮ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর নতুন সড়ক পরিবহন আইন পাস করে। কিন্তু মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলোর চাপে এটি তাৎক্ষণিক কার্যকর করতে পারেনি। আইন করার এক বছরের বেশি সময় পর গত শুক্রবার থেকে কার্যকর হয়েছে আইনটি। তবে এখনো প্রয়োগ করা সম্ভব হয়নি।

গতকালও সড়ক আইন প্রয়োগ নিয়ে সংশ্লিষ্ট সবপক্ষ বিভিন্ন উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। এদের মধ্যে বিআরটিএ’র চেয়ারম্যান ড. কামরুল আহসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা তো ১ নভেম্বর থেকে কার্যকরের জন্য প্রজ্ঞাপন দিয়েছি। কিন্তু অসচেতনতা থাকলে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। তাই সচেতনতা বাড়াতে কাজ শুরু হয়েছে। যেসব জটিলতা দেখা দিয়েছে, সেগুলো সমাধানে কাজ করছি। বিআরটিএ বিধিমালা তৈরি করেনি। সেটি প্রক্রিয়াধীন। আমরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি লিখেছি আইন প্রয়োগে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে। এছাড়া ভ্রাম্যমাণ ম্যাজিস্ট্রেটসহ সব প্রক্রিয়া দ্রুতই শেষ হবে। আশা করছি এ সপ্তাহ পর থেকে আইনটি কার্যকর করতে পারব। আইন মাঠে না নামলে বাস্তবতা বোঝা যায় না।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার শফিকুল ইসলাম গতকালের সংবাদ সম্মেলনে বলেন, আইন প্রয়োগের আগে জনসাধারণকে সচেতন করা হচ্ছে। বাস টার্মিনাল ও গুরুত্বপূর্ণ ইন্টারসেকশনে সচেতনতামূলক মাইকিং করা হচ্ছে। পরিবহন মালিক শ্রমিকদের একত্রে করে তাদের এ আইন সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হচ্ছে ও সচেতনতামূলক লিফলেট বিলি করা হচ্ছে। আমাদের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা প্রায় ৮০০ জন সার্জেন্ট ও টিআইকে নতুন আইন সম্পর্কে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কমিশনার আরও বলেন, নতুন আইনের জন্য পজ মেশিন সফটওয়্যার আপডেটের কাজ চলছে। সেটা না হওয়া পর্যন্ত আমরা কেস সিøপের মাধ্যমে মামলা দেব।

সড়ক পরিবহন আইনে সংযুক্ত বিভিন্ন নতুন বিধান তুলে ধরে কমিশনার বলেন, এ আইনে সাজার পরিমাণ উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে মানুষ সাজার ভয়ে হলেও আইন মানবে। উন্নত বিশ্বের মতো এ আইনে ড্রাইভিং লাইসেন্সের বিপরীতে পয়েন্ট পদ্ধতি রয়েছে। আইন অমান্য করলে পয়েন্ট কমতে থাকবে। একপর্যায়ে বরাদ্দকৃত পয়েন্ট শেষ হলে ড্রাইভিং লাইসেন্স বাতিল হয়ে যাবে। সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণ ও যাত্রীদের বীমার ব্যবস্থা এবং ড্রাইভিং স্কুলের মাধ্যমে ড্রাইভারদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে এ আইনে। এছাড়াও সড়ক দুর্ঘটনায় কেউ নিহত হলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও ৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। সেই সঙ্গে কিছু কিছু অপরাধের কারণে বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তারের বিধান রয়েছে এ আইনে।

কমিশনার আরও বলেন, সড়ক পরিবহন আইনে অপরাধের দায়ে কাউকে জরিমানা করা হলে, সে ক্ষেত্রে আপিলের সুযোগ আছে। পথচারী ফুটওভার ব্রিজ ও জেব্রা ক্রসিং দিয়ে রাস্তা পারাপার না হয়ে যত্রতত্র রাস্তা পারাপার হলে জরিমানা করা হবে।

তবে আইন প্রয়োগের আগে সচেতনতাসহ যথাযথ উদ্যোগ না নেওয়ায় সরকারের সমালোচনা করেছেন পরিবহন খাত বিশেষজ্ঞরা। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শামসুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, সড়কে শৃঙ্খলা শুধু শাস্তির ওপর নির্ভর করে না। আগে সিস্টেম প্ল্যানিং, ডিজাইন, ইঞ্জিনিয়ারিং, এডুকেশনÑ এরপর আইনের প্রয়োগ করতে হয়। যাতে সড়কের সবপক্ষই স্বনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে। কেউই নিজে থেকে অপরাধ করতে আগ্রহী হবে না। এমন পদ্ধতি তৈরি করতে হবে। এগুলো বিবেচনায় না এনে এ আইন কতটুকু কাজে আসবে সন্দেহ আছে।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, এ আইন প্রায় ১৪ মাস আগে জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। তার এক মাস পর গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়। গেজেটের ১৩ মাস পরও সরকারের পক্ষ থেকে জনসাধারণকে জানানোর জন্য যে মাধ্যমগুলো আছে, কোনোটিতেই প্রচারণার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এ আইন সম্বন্ধে জনসাধারণকে অবহিত করা সরকারের দায়িত্ব। তারপর বাস্তবায়ন।