ঢাকা বৃহঃস্পতিবার, ২১শে নভেম্বর ২০১৯, ৮ই অগ্রহায়ণ ১৪২৬


এক বছর নিষিদ্ধ সাকিব


৩০ অক্টোবর ২০১৯ ০৪:০৫

আপডেট:
২১ নভেম্বর ২০১৯ ২৩:৩৪

এ এক আঁধার দিন বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য। সাকিব আল হাসানের জন্য। এবং তারই কারণে। সারা দিন তার বাড়ির সামনে মিডিয়ার অপেক্ষা। দেখা মেলেনি। সন্ধ্যায় ক্রিকেটের সর্বোচ্চ সংস্থা আইসিসি নিষেধাজ্ঞার ঘোষণাটা দিল। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে সকাল থেকে অপেক্ষমাণ মিডিয়ার বিরাট অংশ। তারপরই জানা গেল সাকিব আসছেন।

আসলেন তিনি রাত ৮টার দিকে। আগামী এক বছর সব ধরনের ক্রিকেটে তাকে আইসিসি নিষিদ্ধ ঘোষণা করার দেড় ঘণ্টা পর। ততক্ষণে বিসিবির সামনে সেস্নাগান উঠেছে গোটা পঞ্চাশ সাকিবভক্তের– ‘মানি না, মানব না।’ ‘নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হবে’ ইত্যাদি। বিসিবির মূল গেটের সামনে এই অবস্থা। ক্যামেরা সব সেদিকে তাক করা। ওদিক থেকেই তো সাকিবের আসার কথা।

কিন্তু সাকিব এলেন ৪ নম্বর গেট দিয়ে। পেছনের দরজা দিয়ে। গাড়ি থেকে নামলেন। চেক শার্ট ছেড়ে দেওয়া। জিন্স। বিষণ্ন। এমন অবনত মস্তকের সাকিবকে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে এর আগে কখনো কেউ দেখেনি হয়তো। বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন ও আরও কয়েকজন বোর্ড পরিচালক ও কর্মকর্তা তখন মিরপুরের এই বিসিবি হেডকোয়ার্টারে অপেক্ষমাণ। সেই দুপুরে বিসিবিতে এসে নিজের রুমে বসেছেন বিসিবি সভাপতি। তারপর তাকে আর দেখা যায়নি।

রাত ৮টার সময় সাকিবকে নিয়ে মিডিয়ার সামনে এলেন পাপন। সাকিবের মাথা থেকে ততক্ষণে ধুলোয় লুটাচ্ছে বাংলাদেশের টেস্ট আর টি-টোয়েন্টি অধিনায়কের মুকুট। নিজের দোষে। ম্যাচ ফিক্সার বা জুয়াড়িদের সঙ্গে তিন দফা আলাপের একটিও জানাননি। ২০১৮-এর জানুয়ারি থেকে এপ্রিলের ঘটনা। সাকিব জানতেন, এটা জানাজানি হলে শাস্তি অনিবার্য। তবু জানাননি। এই বছরের জানুয়ারি ও আগস্টে আইসিসির অ্যান্টি করাপশন ইউনিট বা আকসু দুই দফা শুনানি করেছে সাকিবের। পূর্ণ সহযোগিতা করেছেন সাকিব। সব স্বীকার করেছেন। ২৯ অক্টোবর (গতকাল) চিঠি লিখেছেন আইসিসিকে। শাস্তি মেনে নেওয়া চিঠি। তারপরও আইসিসির সংবাদ বিজ্ঞপ্তি এবং ৭ পৃষ্ঠার অপরাধ ও শাস্তিনামা। যেখানে দুই বছরের নিষেধাজ্ঞা সব ধরনের ক্রিকেট থেকে। এর এক বছর স্থগিতাদেশ। মানে ২০২০ সালের ২৯ অক্টোবর থেকে আবার মাঠে ফিরতে পারবেন সাকিব। শাস্তি শেষ করে।

বাংলাদেশের ক্রিকেটে এই আঘাতের তুলনা আছে? পাপন আসেন সাকিবকে সঙ্গে করে। সাকিবকে নার্ভাস দেখায়। সামান্য জোর করে মুখে ফুটিয়ে তোলা হাসিতে এসেছিলেন। কিন্তু সেটা মুহূর্তে উধাও। এরপর সাকিব সালাম দিয়ে শুরু করেন।

‘আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ সারা দিন কষ্ট করে অপেক্ষা করার জন্য। আমার আনুষ্ঠানিক একটা বিবৃতি আছে সেটা আমি পড়তে চাচ্ছি।’

এটুকু বলে মোবাইল ফোনে তুলে আনা লিখিত বিবৃতিটা পড়তে শুরু করে বারবার হোঁচট খান সাকিব, ‘যে খেলাকে আমি সবচেয়ে ভালোবাসি সেই খেলা থেকে নিষেধাজ্ঞা পেয়ে আমি দুঃখিত। তবে অনৈতিক প্রস্তাবের ব্যাপারটি আইসিসির আকসুকে না জানানোয় যে শাস্তি দেওয়া হয়েছে তা আমি মাথা পেতে নিচ্ছি। ক্রিকেটকে দুর্নীতিমুক্ত করতে আইসিসি-আকসু সবচেয়ে বেশি ভরসা করে ক্রিকেটারদের সহযোগিতার ওপর। কিন্তু এই ড়্গেত্রে আমি আমার দায়িত্ব পুরোপুরি পালন করতে পারিনি।’ সাকিব বলে যান, ‘শতকোটি ভক্ত ও অন্যদের মতো আমিও চাই ক্রিকেট থাকুক পুরোপুরি দুর্নীতিমুক্ত। তাছাড়া আগামীর তরুণ প্রতিভাবান খেলোয়াড়রা যেন আমার মতো ভুল না করে সেজন্য আমি আইসিসির আকসুর দুর্নীতি শিক্ষামূলক কার্যক্রমে সম্পৃক্ত থেকে সব রকম সহায়তা করে যাব।’

বোর্ড সভাপতি পাপন বরাবর খুব গাম্ভীর্যের মধ্যে। সাকিবের কথা শেষ হওয়ার পর নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে আবেগেও আক্রান্ত হন, ‘আমরা অবশ্যই শকড। এটা অত্যন্ত, এর চেয়ে বেশি কিছু শকিং হতে পারে তা আমার জানা নেই। কারণ, আমি বহুবার বলেছি, একবার না যে দুটো খেলোয়াড়ের বিকল্প আমাদের নেই। অধিনায়ক হিসেবে বলতাম মাশরাফীর (বিন মোর্ত্তজা) কথা। খেলোয়াড় হিসেবে সাকিব।’

বোর্ড প্রধান হিসেবে ঠিক কী অবস্থায় পড়েছেন সেটা বোঝাতেই যেন পাপন বলে চলেন, ‘অন্য সব বিকল্প পেলেও সাকিবের মতো একজন আমরা আর পাব কি না তা আমার জানা নেই। সে যে বিশ্বসেরা খেলোয়াড় তা আপনারা সবাই জানেন। সাকিবের খেলতে না পারাই আমার জন্য হচ্ছে সবচেয়ে প্রথম ও বড় শকড। আপনারা জানেন যে একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিরিজ সামনে। এই প্রথম আমরা ভারতে এমন গুরুত্বপূর্ণ সিরিজ খেলতে যাচ্ছি। এরপর টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ।’

সাকিবের অনুপস্থিতি বাংলাদেশের ক্রিকেটকে কতটা সংকটে ফেলে দিয়েছে সেটা বোঝাতে পাপন বলছিলেন, ‘আমাদের যত পরিকল্পনা তার সবই সাকিবকে নিয়ে করা হয়েছিল। ওকে ক্যাপ্টেন করার পেছনে এটাই কারণ ছিল যে সে আমাদের নেতৃত্ব দেবে। রাগও হয়েছে। অস্বীকার করছি না। কেন জানাল না ও? স্বাভাবিক। যদিও প্রকাশ করিনি। এখন বলছি।’

সাকিব অপরাধ করেছে। বাজে উদাহরণ তৈরি করেছে। অথচ ছিল সবার চোখের মণি। বিসিবি এসবের কিছুই জানত না জানিয়ে পাপন বলছিলেন, ‘এটাও আমি বলতে চাই যে এটা জেনে আমরা খুশি যে স্বীকার করেছে সেটা বড় কথা নয়, সে সম্পূর্ণ সহায়তা করেছে অ্যান্টি করাপশন ইউনিটের সঙ্গে। এটা স্পষ্ট করে বলতে চাই। সাকিবই সবচেয়ে বড় সাক্ষী। বিসিবি বা আমরা এটার কিছুই জানি না। আমরা শুধু ফল জেনেছি। সাকিব আমাকে দুই-তিন দিন আগে বলেছে।’

তবে যে ভুলের কারণে সাকিব এই শাস্তি পেলেন সেটা মেনে নিয়ে পতিত নায়কের পাশে সব সময় থাকার ঘোষণাও দিয়েছে বিসিবি। যে ঘোষণাটি এসেছে পাপনের কাছ থেকেই, ‘আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস। আমাদের সবার সাকিবের পাশে থাকা উচিত। ওর খুব খারাপ সময় যাচ্ছে। আমি ওকে বলতে চাই, ভেঙে পড়ার কিছু নেই। দুর্নীতি দমনের জন্য ও যেসব সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তা করুক। আমরা ওর সঙ্গে থাকব। আর যখন, যেভাবে ওকে সাপোর্ট করার দরকার তা করতে বিসিবি ওর পাশে থাকবে। আমরা আশা করি, খুব শিগগিরই...খুব শিগগিরই ক্রিকেটে ফেরত আসবে এবং বাংলাদেশকে ক্রিকেটে আরও ভালো অবস্থানে নিয়ে যাবে।’

এর কিছুক্ষণের মধ্যে বোর্ড সভাপতি-কর্মকর্তারা বেরিয়ে যান বোর্ড থেকে। বের হন সাকিবও। ততক্ষণে বিসিবির মূল গেটে সাকিবভক্তদের জমায়েত বেড়েছে। বেড়েছে সেস্নাগানের জোর। ৩ নম্বর বা বিকল্প গেট দিয়ে বিসিবি সভাপতি ও অন্যরা বের হয়ে যান। কলঙ্কিত হয়ে বিসিবিতে আসার পর যাওয়ার জন্যও সাকিবের জন্য বরাদ্দ ওই পেছনের দরজা।