ঢাকা বৃহঃস্পতিবার, ২১শে নভেম্বর ২০১৯, ৮ই অগ্রহায়ণ ১৪২৬


আতঙ্কে থাকেন টিকাটুলী এলাকার ব্যবসায়ীরা,

চাঁদাবাজি করেই কোটিপতি, না দিলেই চলে মঞ্জুর অত্যাচার


২৬ অক্টোবর ২০১৯ ০৩:০৪

আপডেট:
২৭ অক্টোবর ২০১৯ ০১:৫৪

২০১৫ সালের ২৬ আগস্ট টিকাটুলীর রাজধানী ও নিউ রাজধানী সুপারমার্কেটের পাঁচ ব্যবসায়ী ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৩৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ময়নুল হক মঞ্জুর বিরুদ্ধে ওয়ারী থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। পৃথক জিডিতে তারা কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে মার্কেটে চাঁদাবাজির অভিযোগ করেন। মঞ্জুর হাত থেকে তাদের জীবনের নিরাপত্তা চান।

ব্যবসায়ীদের জিডিতে অভিযোগ করা হয়, ২২ আগস্ট দুপুরে ময়নুল হক নিজে মার্কেটের সামনে গিয়ে তাদের হুমকি দিয়েছেন। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি ও ব্যবসা করতে দেবেন না বলে ভয় দেখিয়েছেন তারা। যারা প্রতিবাদ করেন তাদের দোকান মালিক সমিতির কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে কাউন্সিলর শারীরিক এবং মানসিক নির্যাতনও করেন বলে জানান তারা।

জিডিতে অভিযোগ করা হয়, ওয়ার্ড কাউন্সিলর ময়নুল হক মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের মালিকানাধীন রাজধানী ও নিউ রাজধানী সুপারমার্কেট দোকান মালিক সমিতির স্বঘোষিত সভাপতি। কল্যাণ ট্রাস্ট মার্কেট ভেঙে সেখানে নতুন করে বহুতল মার্কেট তৈরি করতে চাইলেও মঞ্জুর কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। আদালতে মামলা-মোকদ্দমা করে সেটিকে তিনি নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন। তিনি সন্ত্রাসীদের মাধ্যমে বিভিন্নভাবে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদাবাজি করে আসছেন।

সন্ত্রাসীদের ভয়ে নিরীহ ব্যবসায়ীরা নীরবে চাঁদা দিয়ে যাচ্ছেন। তার চাঁদাবাজি ও জুলুমের মাত্রা দিন দিন বেড়েই চলেছে।

বিভিন্ন সময় মার্কেটের ব্যবসায়ীরা র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) কাছেও পৃথক অভিযোগ করেছেন। এক সময় র‌্যাব অভিযান চালিয়ে মঞ্জুর অনুসারী ১০ চাঁদাবাজকে আটক করে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জেলে পাঠায়। তবে কিছুদিন পরই ছাড়া পেয়ে যায় তারা। আবারও শুরু করে চাঁদাবাজি।

স্থানীয় বাসিন্দা ও মার্কেটের ব্যবসায়ীদের তথ্যমতে, রাজধানী সুপারমার্কেটে প্রায় দুই হাজার দোকান রয়েছে। ময়নুল হক মঞ্জু অবৈধভাবে গত ৯ বছর ধরে মার্কেটের সভাপতির পদ দখল করে আছেন। সেখানে তিনি যা বলেন, সেটাই নিয়ম। দোকানিদের ওপর অনৈতিকভাবে চাঁদা আরোপ করা হয়। গত কয়েক বছর কোনো লোডশেডিং না থাকলেও জেনারেটরের তেল খরচ বাবদ ৫০০ করে টাকা নেওয়া হয়। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের জন্য ও নানা অনুষ্ঠানের নামেও চলে চাঁদাবাজি। যাদের দিয়ে তিনি এই চাঁদাবাজি করেন তারা সবাই স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী। দোকানিদের কাছ থেকে চাঁদাবাজি করে কোটি কোটি টাকা আয় করছেন তিনি। এ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পুলিশের মহাপরিদর্শকসহ বিভিন্ন স্থানে ব্যবসায়ীরা অভিযোগও দিয়েছেন। কিন্তু কাজ হয়নি।

মঞ্জুর বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসা, জমি দখল, কোরবানির পশুর হাটের নিয়ন্ত্রণ, ফুটপাতে হকার বসিয়ে চাঁদা আদায় প্রভৃতি অভিযোগও রয়েছে। তবে এলাকাবাসীর মতে, মার্কেট দুটি তার সোনার খনি। তাই ওদিকেই তার নজর বেশি। দুটি মার্কেটের প্রায় আড়াই হাজার দোকানের প্রতিটি থেকে অতিরিক্ত দেড় থেকে দুই হাজার টাকা চাঁদা তোলেন তিনি। এভাবে কোটি কোটি টাকার মালিকও হয়েছেন। জনপ্রতিনিধি হওয়ার পরও এলাকার সমস্যার দিকে তার নজর কম। নগর ভবনেও তাকে তেমন দেখা যায় না। ডিএসসিসির এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ২০টি বোর্ড মিটিংয়ের মধ্যে মাত্র পাঁচটিতে তিনি হাজির ছিলেন। টানা তিনবার বোর্ড মিটিংয়ে অনুপস্থিত থাকার নজিরও তার একাধিক। সিটি করপোরেশন আইন অনুযায়ী, টানা তিনটি বোর্ড মিটিংয়ে অনুপস্থিত থাকলে কাউন্সিলর পদে থাকার যোগ্যতা হারাবেন। তার পরও ময়নুল হক মঞ্জু কাউন্সিলর পদে বহাল আছেন।

সরেজমিন রাজধানী সুপারমার্কেটে দেখা যায়, মার্কেটের প্রবেশপথ এবং ফুটপাতেও অবৈধ ছোট ছোট দেড় শতাধিক টেবিল বা চৌকি বসানো। এগুলোতে পসরা সাজানো হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন ব্যবসায়ী বলেন, টেবিল বা চৌকিতে দোকান বসাতে একেকজনকে ময়নুলের লোকদের দিনে ৬০০ টাকা চাঁদা দিতে হয়। ফুটপাতের একজন হকার বলেন, চাঁদা না দিলে হকারদের বসতে দেওয়া হয় না। কিন্তু কেউ প্রকাশ্যে নাম বলতে চান না।

নাম প্রকাশে ভীত প্রায় এক ডজন ব্যবসায়ী বলেন, বিভিন্ন কৌশলে চাঁদাবাজি হচ্ছে। সম্প্রতি দোকান বিক্রি করার পর একজন দোকান মালিকের কাছ থেকে দুই লাখ টাকা চাঁদা নেওয়া হয়। এর আগে ব্যবসায়ী খোকন মিয়া মারা গেলে তার দোকানের সব শাড়ি-কাপড় দোকান মালিক সমিতির কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। ঘটনাটি তাৎক্ষণিকভাবে খোকনের বাবা র‌্যাবকে জানান। কিন্তু শাড়ি-কাপড় আর ফিরে পাননি তারা। কেউ দোকান বিক্রি করতে চাইলে যেমন, তেমনি কিনতে চাইলেও মঞ্জুকে টাকা দিতে হয়।

ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন, বাণিজ্যিক এলাকায় বিদ্যুতের বিল প্রতি ইউনিট ১০ টাকা হলেও মালিক সমিতির নামে প্রত্যেক দোকানির কাছ থেকে ২০ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে। না দিলে মারধর ও দোকানে তালা লাগিয়ে দেওয়া হয়। রাজধানী সুপারমার্কেটের এক হাজার ৭৮৮টি দোকান থেকে এভাবে বিদ্যুৎ বাণিজ্য করেও বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেন ময়নুল হক মঞ্জু। তার এলাকায় ফুটপাতে যত হকার বসে সবাইকেই ১০০ থেকে ৩০০ টাকা চাঁদা দিতে হয়।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, চাঁদার টাকা তোলার জন্য কমপক্ষে চার রকমের রসিদ ছাপিয়েছে দোকান মালিক সমিতি। নানা অজুহাতে এসব রসিদ দিয়ে টাকা তোলা হয়। কিন্তু এসব টাকা কোথায় যাচ্ছে তার হিসাব মঞ্জু কখনোই দেন না। প্রতি মাসে প্রত্যেক দোকানিকে অন্তত দুই হাজার টাকা চাঁদা দিতে হয়। মার্কেটের বিদ্যুতের পুরোনো কেবল পরিবর্তন করার কথা বলেও মাঝে মধ্যে টাকা নেওয়া হয়। কিন্তু তা আর পরিবর্তন করা হয় না। সিটি করপোরেশনের ভাড়া দোকানপ্রতি দু-তিনশ' টাকা হলেও আদায় করা হয় এক হাজার টাকা। রমজানের সময় ইফতার পার্টির কথা বলে পৃথক চাঁদা নেওয়া হয়। ঈদ এলেই কর্মচারীদের ঈদ বোনাস, পোশাক, লাঠি-বাঁশি-জুতা ক্রয় প্রভৃতি অজুহাতে চাঁদা নেওয়া হয়। এ ছাড়া আছে সার্ভিস চার্জ। নানাভাবে চাঁদাবাজি করছেন ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের এই সদস্য।

এসব অভিযোগের বিষয়ে ময়নুল হক মঞ্জু বলেন, তিনি কোনো চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত নন। প্রয়োজনে সিটি করপোরেশন তদন্ত করে দেখতে পারে। তার এলাকায় কোনো অবৈধ জুয়া-ক্যাসিনো নেই। অথচ সব সময় তার বিরুদ্ধে কেবলই চাঁদাবাজির অভিযোগ আনা হয়। যার কোনো ভিত্তি নেই। তিনি জানান, এই মার্কেটের দোকানি নয় এমন কিছু লোক মার্কেট দখলের অপচেষ্টা চালিয়েছিল। তারাই তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন জায়গায় অভিযোগ দিচ্ছে। অথচ তিনি সব সময় মার্কেটের ব্যবসায়ীদের স্বার্থের কথা ভেবে কাজ করেন। এ জন্য তিনি এলাকায় খুব জনপ্রিয়ও তিনি।

কাউন্সিলর মঞ্জু বোর্ড সভায় উপস্থিত না থাকার বিষয়টিকে স্বীকার করে বলেন, অনুপস্থিতির ব্যাখ্যাও রয়েছে তার কাছে। মঞ্জু বলেন, এলাকার উন্নয়ন কাজে ঠিকাদারদের বিল-ভাউচারে তিনি কাউন্সিলরের স্বাক্ষর বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু তা মানা হয়নি। কাউন্সিলরের স্বাক্ষর থাকলে কাজ ভালো হতো। সেটা না থাকায় ঠিকাদাররা নিম্নমানের কাজ করছে।