ঢাকা শনিবার, ২৩শে নভেম্বর ২০১৯, ১০ই অগ্রহায়ণ ১৪২৬


'বুড়োলীগ' থেকে বের হচ্ছে যুবলীগ,বাদ পড়ছেন বিতর্কিতরা


১৮ অক্টোবর ২০১৯ ১৩:৪৮

আপডেট:
২৩ নভেম্বর ২০১৯ ০৬:২৪


আওয়ামী যুবলীগের বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ 'বুড়ো'রা বিদায় নিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র।

জানা যায়,গঠনতন্ত্রে বয়সের বাধ্যবাধকতা না থাকলেও বুড়োদের কাছ থেকে মুক্ত করে যুবকদের হাতেই নেতৃত্ব দিতে চায় আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড। সংগঠনের নেতৃত্ব নির্বাচনে বয়সসীমা নিয়ে ভাবছেন দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনা।

ক্যাসিনো ও দুর্নীতিবিরোধী সাম্প্রতিক অভিযান এবং সংগঠনের সপ্তম জাতীয় কংগ্রেস সামনে রেখে এ প্রশ্নটি এখন ঘুরেফিরেই আসছে। আগামী ২৩ নভেম্বর শনিবার সকাল ১১টায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে যুবলীগের কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হবে।

বেশ কিছু দিন ধরেই যুবলীগ নেতাদের বয়স নিয়ে নানামুখী আলোচনা চলছে। অনেকেই বর্তমান কমিটির বুড়িয়ে যাওয়া নেতৃত্বের সমালোচনায় মুখর। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন মন্তব্য করা হচ্ছে। এ অবস্থায় ছাত্রলীগের মতো যুবলীগের নেতৃত্বে আসার বেলায় বয়সসীমা বেঁধে দেওয়ার গুজব-গুঞ্জন রয়েছে।

যুবলীগের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীর বয়স ৭১ পেরিয়েছে। ৩৫১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটিতে হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া সবাই ৬০ বছর পেরিয়ে গেছেন। কারও কারও বয়স ৭০-এর কোঠা ছাড়িয়েছে। সর্বোচ্চ পাঁচজন কেন্দ্রীয় নেতাও খুঁজে পাওয়া যাবে না, জাতীয় যুবনীতি অনুযায়ী যাদের বয়স ৩৫ বছরের নিচে।

সংগঠনের প্রেসিডিয়ামের ২৭ নেতার মধ্যে বেশিরভাগেরই বয়স ৬০ বছর পেরিয়ে গেছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন ড. মীজানুর রহমান, শেখ শামসুল আবেদীন, চয়ন ইসলাম, ড. আহমদ আল কবির, আলতাফ হোসেন বাচ্চু, জাহাঙ্গীর কবির রানা, সিরাজুল ইসলাম মোল্লা, শাহজাহান ভূঁইয়া মাখন, প্রকৌশলী নিখিল গুহ ও সৈয়দ মাহামুদুল হক।

প্রেসিডিয়ামের অন্য সদস্যরাও এরই মধ্যে ৫০ বছর পেরিয়ে এসেছেন। তারা হচ্ছেন- আবুল বাশার, মোহাম্মদ আলী খোকন, আনোয়ারুল ইসলাম, অধ্যাপক এবিএম আমজাদ হোসেন, অ্যাডভোকেট মোতাহার হোসেন সাজু ও ডা. মোখলেছুজ্জামান হিরু। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশীদের বয়স ৬০-এর ওপরে।

নাসরিন জাহান চৌধুরী শেফালী ছাড়া পাঁচ যুগ্ম সম্পাদকও ৫০ ছাড়িয়েছেন। নয় সাংগঠনিক সম্পাদকের মধ্যে সালাউদ্দিন মাহমুদ জাহিদ ও আমির হোসেন গাজীর বয়স ৬০-এর কোঠায়। অন্যদের বয়সও ৫০ পেরিয়েছে। ২৫ জন সহ-সম্পাদক এবং ৪১ জন কার্যনির্বাহী সদস্যের মধ্যে বেশিরভাগ নেতার বয়স ৬০ পেরিয়ে গেছে। কেন্দ্রীয় সদস্যদেরও বয়স গড়ে ৫৫ বছরের ওপরে।

অর্থাৎ বর্তমানে আওয়ামী যুবলীগের নেতৃত্বে যুবক নেই। বুড়োরাই আছেন। এই বুড়োদের নেতৃত্বেই চলছে যুবকদের সংগঠন যুবলীগ। অথচ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে ১৯৭২ সালের ১১ নভেম্বর তারুণ্যনির্ভর যুবলীগ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যুবনেতা শেখ ফজলুল হক মনি। ওই সময়ে তার বয়স ছিল ৩২ বছর।

যুবলীগের প্রথম জাতীয় কংগ্রেসে অনুমোদিত গঠনতন্ত্রে সংগঠনের সদস্য হওয়ার বেলায় বয়সের বাধ্যবাধকতা ছিল। ওই সময়ে ৩৫ বছরের বেশি বয়সী যুবক এবং যুবার যুবলীগের সদস্য হওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না বলে জানিয়েছেন সংগঠনের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশীদ। এরপর দীর্ঘ সময় ওই বয়সসীমা অনুসরণ করা হয়নি। উল্টোটা হয়েছে।

২০১২ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ষষ্ঠ কংগ্রেসে অনুমোদিত সংগঠনের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, যে কোনো যুবক ও যুবার যুবলীগের সদস্য হওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে বয়সসীমা সুনির্দিষ্ট করা হয়নি। এই সুযোগেই যে কোনো বয়সের ব্যক্তিরা যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতা হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। এর মধ্য দিয়েই যুবকদের সংগঠন যুবলীগ মূলত বুড়োদের সংগঠনে রূপ নিয়েছে।

এদিকে,সূত্রমতে, ১৯৭২ সালের ১১ নভেম্বর যুবলীগ প্রতিষ্ঠার পর ছয়টি জাতীয় কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১৯৭৪ সালে প্রথম জাতীয় কংগ্রেসে মাত্র ৩৩ বছর বয়সে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন শেখ ফজলুল হক মণি। ওই সময় যুবলীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ৪০ বছরের একটি বয়সসীমার বিধান ছিল। ১৯৭৮ সালে অনুষ্ঠিত সংগঠনটির দ্বিতীয় জাতীয় কংগ্রেসে ওই বিধানটি বাতিল করা হয়। ৩৮ বছর বয়সে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন আমির হোসেন আমু। ১৯৮৬ সালে তৃতীয় কংগ্রেসে ৩৭ বছর বয়সে মোস্তফা মহসীন মন্টু, ১৯৯৬ সালে চতুর্থ কংগ্রেসে ৪৭ বছর বয়সে শেখ ফজলুল করিম সেলিম, ২০০৩ সালে ৪৯ বছর বয়সে জাহাঙ্গীর কবির নানক এবং ২০১২ সালের সর্বশেষ সম্মেলনে ৬৪ বছর বয়সে মোহাম্মদ ওমর ফারুক চৌধুরী চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। অর্থাৎ পর্যায়ক্রমে বুড়োরাই যুবলীগের নেতৃত্বে এসেছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে লেখক ও সাংবাদিক সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেছেন, স্বাভাবিক কাণ্ডজ্ঞান থাকলে যুব সংগঠনের নেতৃত্বে বুড়োরা থাকত না। আর যুব সংগঠনের দরকারও নেই। এটা মূল দলের কাজেও আসে না। মূল দলের অনেক নেতার বয়স ৪০ বছর। অথচ এর দ্বিগুণ বয়সীরা যুব সংগঠনে রয়েছে। তিনি যুব সংগঠনের সদস্যদের বয়স ৩৫ বছরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত বলে মন্তব্য করেছেন।


সাবেক ছাত্রনেতা ও যুবলীগের বর্তমান কমিটিতে যারা রয়েছেন, আগামীতে যুবলীগের শীর্ষ পদে আসতে চান এমন প্রায় ২০ জন নেতার সঙ্গে কথা হয় । তারা জানিয়েছেন, আসন্ন যুবলীগের কংগ্রেসে বয়সসীমা নির্ধারণ করা হোক।

বুড়ো লীগ থেকে বের হয়ে তারুণ্য নির্ভর যুব সংগঠন করতে হবে। তাহলে অনেক সাবেক ছাত্রনেতা রয়েছেন, যারা পদ-পদবিতে আসার সুযোগ পাবেন। বয়সসীমা নিয়ে এখনো কোনো নির্দেশনা পাননি জানিয়ে যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশিদ , বয়সসীমা নির্ধারণ করা নিয়ে এখনো কোনো নির্দেশনা পাইনি। তবে দাবি উঠলে বা

নির্দেশনা পেলে গঠনতন্ত্র উপকমিটি আছে, তারা ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। যুবলীগের সাবেক চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগের বর্তমান যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক  বলেন, যুবলীগের কংগ্রেসে বয়স নিয়ে নতুন করে ভাবছেন দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনা। তিনি যে নির্দেশনা দেবেন, সে অনুযায়ী আগামীর নেতৃত্ব আসবে। তিনি আরও বলেন, যুবলীগের ইমেজ ফেরাতে পরিচ্ছন্ন ও দক্ষ সংগঠককেই বসানো হবে।