ঢাকা রবিবার, ২০শে অক্টোবর ২০১৯, ৬ই কার্তিক ১৪২৬


সম্রাটের নথিতে শতাধিক নাম, চাঁদার অঙ্ক


৮ অক্টোবর ২০১৯ ১২:২৪

আপডেট:
২০ অক্টোবর ২০১৯ ১৪:৪৯

‘ক্যাসিনো গডফাদার’ হিসেবে পরিচিত যুবলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটের কাছ থেকে যারা বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন তারা এখন আতঙ্কিত।

কারণ তার আস্তানায় এমন একটি নথি পেয়েছে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো যাতে অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম রয়েছে। যে নথিতে প্রতি মাসে তিনি কাকে কত টাকা দিতেন সেই হিসাব আছে। সম্রাটের অন্যতম সহযোগী যুবলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াও ওইসব প্রভাবশালীকে নিয়মিত অর্থ দিয়ে আসছিলেন।

গত রবিবার ভোরে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থেকে সম্রাটকে গ্রেপ্তারের পর তাকে প্রাথমিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদের তিনি ওই প্রভাবশালীদের ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য দিয়েছেন। তাদের মধ্যে রাজনৈতিক নেতাদের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারাও রয়েছেন। সব মিলে তাদের সংখ্যা শতাধিক।

সংশ্লিষ্টরা আরও জানিয়েছেন, প্রতি রাতেই ক্যাসিনো ও চাঁদাবাজির কোটি কোটি টাকা জমা হতো সম্রাটের দরবারে। সন্ধ্যা হলেই কাকরাইলের ভূঁইয়া ম্যানশনের চতুর্থ তলায় হাজির হতেন তার অপরাধ সাম্রাজের হোতারা। বস্তায় ভরে নিয়ে যেতেন টাকা। প্রতিদিনই এসব টাকা ভাগ-বাটোয়ারা হতো।

টাকা নিতে অনেকেই ধরনা দিতেন সম্রাটের দরবারে। তাদের মধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তি রয়েছেন। তবে কোনো কোনো ব্যক্তিকে মোটা অঙ্কের টাকা পাঠানো হতো মাসের শেষদিকে। টাকা পাঠাতে দেরি হলে তারা নিজেরাও যোগাযোগ করতেন।

আওয়ামী লীগের প্রথম সারির কয়েক নেতা, সরকারি কর্মকর্তা থেকে শুরু করে টাকা পাঠানো হতো বিভিন্ন খাতের প্রভাবশালীদের কাছে। এমনকি দেশের বাইরে অবস্থান করা নেতা এবং সন্ত্রাসীদেরও টাকা পাঠাতেন সম্রাট। এসব টাকার একটি অংশ সঙ্গী এবং অনুসারীদের দেওয়া হতো।

গ্রেপ্তার অভিযানে অংশ নেওয়া র‌্যাবের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, গ্রেপ্তারের পর একপর্যায়ে অপরাধের জন্য তার সঙ্গী এবং আওয়ামী লীগের অনেক সিনিয়র নেতাকেও দায়ী করেছেন সম্রাট। তিনি দাবি করেছেন, তার কাছ থেকে টাকার ভাগ নিয়েছেন অনেকেই। দলীয় সভা-সমাবেশেও বিপুল টাকা ব্যয় করতেন।

জানিয়েছেন, ‘পোলাপান’ সংগ্রহ করতে টাকা লাগে। তাদের হাতখরচ দিতে হয়। তাদের পরিবারের প্রয়োজনেও টাকা দিতে হয়। আবার কর্মীদের মধ্য থেকেই অনেকে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা নিয়ে হাজির হতো তার কাছে।

তারা অবৈধ নানা ব্যবসা, দোকান, ফুটপাত দখল থেকে টাকা আনত। বড় অঙ্কের টাকা আসত ক্যাসিনো ও মাদক কারবার থেকে। সম্রাটের অনুসারীদের অনেকেই সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর, এমনকি তার এই সিন্ডিকেটে কয়েকজন সংসদ সদস্যও রয়েছেন। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, তার এই অবৈধ টাকার লেনদেনের হিসাব রাখতেন যুবলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের দপ্তর সম্পাদক এমদাদুল হক। তবে টাকা লেনদেনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতেন সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। অবশ্য কয়েক মাস আগে টাকার লেনদেন নিয়েই সম্রাটের সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টি হয় খালেদের। সম্রাটের অবৈধ আয়ের একটা বিরাট উৎস নিয়ন্ত্রণ করতেন ঢাকা দক্ষিণের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর এ কে এম মমিনুল হক সাঈদসহ বেশ কয়েকজন কাউন্সিলর।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গ্রেপ্তারের পর দফায় দফায় সম্রাটকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরে তাকে নিয়ে কাকরাইলে ভূঁইয়া ম্যানশনে অভিযান চালায় র‌্যাব। সম্রাটের অফিস ও আস্তানা থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু নথি ও আলামত জব্দ করা হয়েছে। গ্রেপ্তারের আগে তিনি কীভাবে অপরাধমূলক কর্মকা-ে যুক্ত ছিলেন সেই তথ্য দিয়েছেন। জানিয়েছেন, ক্যাসিনো কারবার চালিয়ে প্রতিদিনই মোটা অঙ্কের অর্থ কামাতেন।

তিনি দাবি করেছেন, আওয়ামী লীগ ও যুবলীগসহ বিভিন্ন সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের নিয়মিত অর্থ দিতেন। পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনগুলোতে অর্থ দিতেন। বিএনপি ও যুবদলের নেতারাও তার কাছ থেকে টাকা নিতেন। আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কতিপয় শীর্ষ কর্মকর্তাকে নিয়মিত ‘মাসোহারা’ দিয়েই ক্যাসিনো কারবার চালিয়ে আসছিলেন। সম্রাট আরও জানিয়েছেন, খালেদও রাজনৈতিক নেতা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের মাসোহারা দিতেন এবং দামি দামি উপহার পাঠাতেন। খালেদ ক্যাসিনোর পাশাপাশি টেন্ডারবাণিজ্যও করতেন। যুবলীগ নামধারী নেতা জি কে শামীমও সম্রাটের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, দক্ষিণ যুবলীগের প্রভাবশালী নেতা মিল্কী হত্যাকা-ের পর মতিঝিল, ফকিরাপুল, পল্টন, কাকরাইল, বাড্ডা এলাকায় অপরাধজগতের একক আধিপত্য তৈরি করেন সম্রাট। ঢাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান আহমেদের (সম্প্রতি দুবাইতে গ্রেপ্তার) সঙ্গে মিলে অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণ করতেন। সম্রাটের পাশাপাশি তার বড় ভাই বাদল চৌধুরীও ক্যাসিনো কারবার করতেন। বর্তমানে বাদল সিঙ্গাপুরে আছেন। প্রতিদিন সম্রাটের আয় ছিল অন্তত কোটি টাকা। আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের কাছে চাঁদা দাবি করায় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তদন্ত শুরু হয় এবং সত্যতা পাওয়া যায়। তারপর তার গতিবিধি পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা হয়।

পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা  বলেন, গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অনেক অজানা তথ্য দিয়েছেন সম্রাট। কোন কোন রাজনৈতিক নেতাসহ কাকে কাকে নিয়মিত টাকা দিতেন সেই হিসাব লিখে রাখতেন।

তার আস্তানা থেকে এ সংক্রান্ত একটি নথি পাওয়া গেছে। ওই নথিতেই অনেক কিছু লেখা ছিল। তার মধ্যে আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের বেশ কয়েকজন নেতাকে অর্থ দিতেন তিনি। যাদের মোটা অঙ্কের অর্থ দিতেন তাদের নগদেই বেশি দিতেন।

তাদের মধ্যে কাউকে ১ কোটি, কাউকে ৫০ লাখ, কাউকে ২০ লাখ থেকে শুরু করে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিলি করতেন। সম্রাটের পাশাপাশি খালেদ এবং জি কে শামীমও একইভাবে টাকা বিলাতেন। তবে কয়েকজন প্রভাবশালীকে চেকের মাধ্যমেও টাকা দিতেন সম্রাট। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘ক্ষমতার প্রভাব বিস্তার করে অনেককে কাবু করতেন সম্রাট। ক্লাবপাড়ায় ক্যাসিনো কারবার করলেও ভয়ে কেউ কথা বলতেন না। এমনকি আমরা অভিযান চালানোর সাহসও পেতাম না।’