ঢাকা বৃহঃস্পতিবার, ১৯শে সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৫ই আশ্বিন ১৪২৬


বস্তিবাসীর অভিযোগ, এই অগ্নিকাণ্ডের পেছনে হাত আছে স্থানীয় সাংসদ ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লার

জমি খালি করতেই বস্তিতে আগুন দেয় সাংসদ ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লা!


১৮ আগস্ট ২০১৯ ১১:১৪

আপডেট:
১৮ আগস্ট ২০১৯ ১১:২২

বড় বড় ভবন তৈরির জন্য জমি খালি করতেই মিরপুরের রূপনগরে চলন্তিকা বস্তিতে আগুন দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের দাবি, আগুন লাগার সময় তারা কেরোসিনের গন্ধ পেয়েছেন এবং বস্তির উত্তর-দক্ষিণ দুদিক থেকেই আগুন ছড়িয়ে পড়তে দেখেছেন।

বস্তিবাসীর কারও কারও অভিযোগ, এই অগ্নিকাণ্ডের পেছনে হাত আছে স্থানীয় সাংসদ ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লার, ৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাজি রজ্জব আলী ও তাদের বাহিনীর।

তবে এসব অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন সাংসদ ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লা। তিনি  বলেন, ‘মানুষের উপকার করতে গেলে কত কথাই বলে। কয়েক বছর আগে কালশীতে আগুন লাগার ঘটনায় ১ নম্বর আসামি ছিলাম আমি ইলিয়াস মোল্লা। এমনভাবে কথা কইছে তারা যে ইলিয়াস মোল্লা আইছে, ওসি আইছে ম্যাচ দিয়া আগুন ধরায়া দিছে। এসব কথা তো বইলা লাভ নাই। আমি ইলিয়াস মোল্লা শান্তি চাই। অশান্তি চাই না।’

চলন্তিকা বস্তিটি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৬ নম্বর ওয়ার্ডে। অভিযোগের বিষয়ে ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাজি রজ্জব মোল্লা  বলেন, ‘আমার আর ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লার খাইয়া কাম নাই যে বস্তিতে আগুন লাগামু। মানুষ তো কত কথাই কয়। এসবের প্রমাণ কই। আগুন লাগার পর বস্তির লোকজনকে স্থানীয় স্কুলগুলোতে থাকার জায়গা করে দিয়েছি। তাদের মধ্যে রান্না করা খাবার দিচ্ছি। তাদের পুনর্বাসনের চেষ্টা করছি। অথচ তারা আমাদের বিরুদ্ধে নানা কথা ছড়াচ্ছে।’

চলন্তিকা বস্তিটি মিরপুরের সর্ববৃহৎ বস্তি। গণপূর্ত অধিদপ্তরের জমির ওপর এই বস্তি গড়ে তোলা হয়েছে। দীর্ঘদিন থেকেই বস্তির জমি খালি করার চেষ্টা করছে গৃহায়ন কর্র্তৃপক্ষ। কিন্তু বস্তিবাসীর বাধায় সেটা সম্ভব হয়নি। ঈদের ছুটিতে বস্তিতে যখন লোকজন কম, ঠিক ওই সময় শুক্রবার সন্ধ্যায় আগুন লাগে বস্তিতে। মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়া সেই আগুনে গৃহহীন হয়ে পড়ে প্রায় ২০ হাজার পরিবার। তাদের সবকিছু পুড়ে যাওয়ায় একরকম নিঃস্ব হয়ে পড়ে তারা।

হঠাৎ লাগা আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার নেপথ্য কারণ হিসেবে আগুন নেভানো ও উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা বলেন, বস্তির ভেতরে ঝুঁকিপূর্ণ প্লাস্টিকের পাইপ দিয়ে গ্যাস লাইন টানা ছিল। আর আগুন লাগার সময় গ্যাসের প্রেশারও ছিল বেশি। তা ছাড়া কিছু সিলিন্ডার থেকে প্লাস্টিকের পাইপ দিয়ে ঘরে ঘরে গ্যাস লাইন টানা ছিল। যার ফলে আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে গ্যাসের পাইপ দিয়ে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হওয়ায় সেটা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে।

চলন্তিকা বস্তির বাসিন্দা সাইদুল বলেন, আগুন লাগার সময় তিনি পাশেই ছিলেন। উত্তর ও দক্ষিণ- দুদিকেই আগুন দেখা গেছে। তিনিসহ আরও কয়েকজন বস্তিবাসী দাবি করেছেন, বস্তির দখল করতে এবং জায়গা খালি করে দেওয়ার জন্য দুদিক থেকে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাদের বক্তব্য, দুর্ঘটনা হলে এক দিকে আগুন লাগবে। কিন্তু একই সময়ে দুই পাশে আগুন লাগবে কেন?

আগুন লাগার সময় কেরোসিনের গন্ধ পেয়েছেন বলে দাবি করেছেন বস্তির কয়েকজন বাসিন্দা। আবার অনেকে অভিযোগ করেন, আগুন লাগার দুই ঘণ্টা পর ফায়ার সার্ভিস এসেছে। যখন বস্তি পুড়ে প্রায় শেষ, তখন ফায়ার সার্ভিস পুরোদমে কাজ শুরু করে। তাই তাদের সন্দেহ, এই আগুন দুর্ঘটনাক্রমে লাগেনি। লাগানো হয়েছে।

বস্তিতে থাকা পোশাককর্মী হেলেনা বলেন, ঈদের সময় বেশির ভাগ মানুষ গ্রামের বাড়িতে ছিল। বস্তির অনেক ঘর ছিল খালি। সেই সুযোগেই আগুন দেওয়া হয়েছে।

ঈদের কিছুদিন আগেও বস্তিতে আগুন দেওয়ার অপচেষ্টার কথা জানান দুই বস্তিবাসী। তারা বলেন, ঈদের কয়েক দিন আগেও বস্তির জনৈক ইব্রাহিমের ঘর থেকে আগুন লেগেছিল। সেবার আমরা দ্রুত দেখতে পাই এবং আগুন আমরাই নিভিয়ে ফেলি। এবার আর সেই সুযোগ আমাদের দেওয়া হয়নি।

বস্তির বাসিন্দা আফজাল বলেন, ‘এডা সরকারের জায়গা আমরা জানি। যে যেমনে পারছি ঘর উডায়া থাকছি বা ঘর ভাড়া নিয়া থাকছি। ছাইড়া যাইতে বললে আমরা চলে যেতাম। আমাদের নাকি বাউনিয়া নিয়ে যাবে। তাহলে নিয়ে যাক। এমনে আগুন দিয়ে আমাদের সব শেষ করে দিল কেন?’

আগুন লাগার কারণ হিসেবে ‘উচ্ছেদের ষড়যন্ত্র’ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, এমন কোনো তথ্য তার জানা নেই।

আগুন লাগার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক রেজাউল করিম বলেন, তদন্ত কমিটি আগুন লাগার কারণ ও ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে কাজ করছে। তদন্ত শেষে আগুন লাগার কারণ বলা যাবে। আমরা এখন প্রত্যক্ষদর্শী ও ক্ষতিগ্রস্তদের বক্তব্য নিচ্ছি। দেরিতে পৌঁছানোর অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, ৭টা ২২ মিনিটে আগুনের সংবাদ পাওয়ার পর ৬ মিনিটের মধ্যে (৭টা ২৮ মিনিটে) ফায়ার সার্ভিসের অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে।

প্রসঙ্গত, গত শুক্রবার সন্ধ্যা সোয়া ৭টার দিকে আগুন লাগে রূপনগরের চলন্তিকা ঝিলপাড় মসজিদের পাশের বস্তিতে। ৩০ বিঘা জায়গার ওপর গড়ে ওঠা এ বস্তিতে প্রায় ২০ হাজার পরিবারের ৫০ হাজারের বেশি মানুষ থাকত। ফায়ার সার্ভিসের প্রায় ২৪টি ইউনিট প্রায় তিন ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে রাত সাড়ে ১০টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার ঘোষণা দেয়। এ ঘটনায় কোনো প্রাণহানি হয়নি। তবে চারজন আহত হয়েছেন।