ঢাকা শনিবার, ২০শে জুলাই ২০১৯, ৬ই শ্রাবণ ১৪২৬


পঁচা ফল দিয়ে জুস বানাচ্ছে ‘পলাশী জুস কর্ণার’


১৯ জুন ২০১৯ ০০:৪১

আপডেট:
১৯ জুন ২০১৯ ০০:৪৮

‘দুপুরের দিকে পলাশীতে গিয়েছিলাম জুস খেতে ৷ পলাশী জুস কর্ণার এ ৷ জুস মুখে দিতেই কেমন জানি লাগলো ৷ সাথে বুয়েটের এক ভাই ছিলো আর বঙ্গবন্ধু হলের এক ভাই ৷ এরপর যখন বললাম, যে জামগুলা থেকে জুস বানিয়েছেন সেগুলো দেখান ৷ তখন দোকানের লোকটি ইতস্ততবোধ করছিল ৷ বঙ্গবন্ধু হলের ঐ ভাই যখন ভিতরে গিয়ে বের করলো তখন দেখি ভিতরে এই অবস্থা ৷ সবগুলোই বাসি ৷ গন্ধ বের হচ্ছে ৷’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এমন তথ্যই দিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) অমর একুশে হলের এক শিক্ষার্থী।

ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, “দুপুরে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) সংলগ্ন পলাশী বাজারে জুস খেতে যাই। পলাশী জুস কর্ণারে জুস খেতে তখন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের একজন বড় ভাই, বুয়েটের দুই শিক্ষার্থীসহ বেশ কয়েকজন দাঁড়িয়ে ছিলেন। বঙ্গবন্ধু হলের সে ভাই প্রথমে আমের জুসের অর্ডার করলেন। সন্দেহবশতঃ তিনি দোকানের ভেতরে গিয়ে দেখেন সব আম পঁচা। বুয়েটের দুইজন শিক্ষার্থী জামের জুসের অর্ডার করেছিল, সেগুলোর অবস্থা আরো খারাপ। এরপর আমি ভেতরে গিয়ে দইয়ের বাটি নিয়ে আসি যেখানে কিছু পোকা পড়েছিল।”

“এরপর বঙ্গবন্ধু হলের সে ভাই প্রক্টরিয়াল টিমের সদস্যদের কল দিলে তারা ঘটনাস্থলে আসে। তিনি এ ফাঁকে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে কল দেন। তবে সেখান থেকে কোনো সাড়া মেলেনি।”

“এ সময় দোকানের এক কর্মচারিকে পঁচা ফলের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রথমে তিনি কিছু বলতে চান নি। পরে পুলিশের ভয় দেখালে তিনি সব স্বীকার করেন। তিনি জানান, এ আমগুলো এক মাস আগে কেনা হয়েছিল। প্রতিদিন জুসের জন্য কাটা আমের অবশিষ্ট অংশ ফ্রিজে রেখে দেওয়া হয়। আর জামগুলোও চারদিন আগের। তবে সেগুলো ফ্রিজে রাখা হয় নি। অন্যান্য ফলগুলোও একই রকম পঁচা বা বাসি।”

“এরপর দোকানের মালিক ঘটনাস্থলে আসে এবং সলিমুল্লাহ মুসলিম (এসএম) হলের এক ভাইকে কল দিয়ে আমাকে তার সাথে কথা বলতে বলে। আমি রাজি হই নি, কারণ আমার মনে হয়েছে আমি কথা বললে এত বড় ঘটনা এখানেই থেমে যাবে। আমি চেয়েছি এ ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, শিক্ষার্থীসহ সবাইকে জানাতে, যাতে তারা সচেতন হয় এবং দোষীরাও আর এ ধরনের কাজ করার সাহস না পায়।”

তিনি বলেন, “এরপর এসএম হলের ৭-৮ জন শিক্ষার্থী ঘটনাস্থলে আসে। তাদের মধ্যে ছিলেন এসএম হল সংসদের সহ-সভাপতি (ভিপি) এম এম কামালও। তিনি এসে বঙ্গবন্ধু হলের সে ভাইকে বললেন, আমরা তো পাশের হলেরই শিক্ষার্থী। ব্যাপারটা আমাদের ওপর ছেড়ে দেন। পলাশীতে কিছু হলে তো আমরাই দেখি। সেজন্য ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে কল দেওয়া আপনার উচিত হয়নি। তাদের মধ্য থেকে কয়েকজন এমনও বলেছে যে, পলাশী বাজার, আজিজ সুপার মার্কেট এগুলো পাশ্ববর্তী হলের শিক্ষার্থীরা দেখে। তখন আমি তাদের কাছে জানতে চেয়েছি যে, এমন করে কোনো ভাগ দেওয়া আছে কিনা। তখন এসএম হলের সিনিয়র ভাই (হল সংসদের ভিপি) আমাকে বলে যে, আপনি বেশি কথা বলবেন না। তিনি এতটাই রেগে গেছেন যে, আমি যদি আর একটি রিপ্লাইও দিতাম, তারা সবাই মিলে আমাকে মারতো।”

ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা প্রক্টরিয়াল টিমের সদস্যদের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগও তুলেছেন এই শিক্ষার্থী।

বঙ্গবন্ধু হলের সে শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “এই ঢাকা শহরে আমি কোনোকিছুই চেক না করে খাই না। দুপুরে পলাশী বাজারে পাকা আমের জুম খেতে যাই। কিন্তু স্বভাবসুলভ দোকানদারকে যে আম দিয়ে জুস বানানো হবে তা দেখাতে বলি। কিন্তু তিনি দেখাতে না চাওয়ায় আমার সন্দেহ হয়। পরে চেক করে দেখি আম সব পঁচা। পরবর্তীতে সব ফল একে একে বের করে দেখি সবগুলো ফলই মোটামুটি পঁচা। তখন আমি কয়েকজন সাংবাদিক বন্ধু ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিমকে বিষয়টি জানাই। আমি এ বিষয়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরেও কথা বলেছি। এবসময় এসএম হলের কয়েকজন শিক্ষার্থী সেখানে আসে। আমি চেয়েছিলাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিষয়টি দেখুক। কিন্তু প্রক্টরিয়াল টিম সেখানে আসলেও তারা শুধু দাঁড়িয়েই ছিল। পরবর্তীতে আমাকে এসএম হলের ভিপি বিষয়টি তাদের হাতে ছেড়ে দিতে বলেন। তিনি বলেন যে, পলাশীতে কিছু হলে তা নাকি এসএম হলের শিক্ষার্থীরা দেখেন। এমনকি তিনি আমাকে বলেন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে কল দেওয়া নাকি আমার উচিত হয়নি।”

ঘটনার পূর্ণ বিবরণ দিয়ে এসএম হল সংসদের সহ-সভাপতি (ভিপি) এম এম কামাল বলেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন শিক্ষার্থী জুস খেতে গিয়ে পেটে সমস্যা হয়েছে বলে অভিযোগ করে। আমি ঘটনা শুনি। এ বিষয়ে আমার সঙ্গে প্রক্টরের সঙ্গেও কথা হয়। তিনি আমাকে ঘটনাস্থলে গিয়ে কি হয়েছে তা দেখতে বলেন। আমি সেখানে যাই এবং শিক্ষার্থীদের কথা শুনি। আমরা চাচ্ছিলাম ঘটনাটি যেন অন্যদিকে না যায়। অভিযুক্তও বারবার বিনীতভাবে ক্ষমা চেয়ে বলছিল যে, এমন কাজ তিনি আর করবেন না। পরে তার কাছ থেকে এ মর্মে একটি লিখিতও নেওয়া হয়েছে। পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ পাওয়া পেলে অ্যাকশন নেওয়ার কথা আমরা বলেছি।”

‘পলাশীতে কিছু হলে এসএম হলের শিক্ষার্থীরাই দেখবে’ এমন মন্তব্য সেখানে করেছিলেন কিনা জানতে চাইলে কামাল বলেন, “যারা যারা সেখানে উপস্থিত ছিলেন তাদের সাথে কথা বলে জাস্টিফাই করেন। যে অভিযোগ করেছে তাকে আমার কাছে নিয়ে আসেন, আমি সামনাসামনি কথা বলব। শিক্ষার্থীদের পক্ষে স্ট্যান্ড নেওয়ার জন্য সেখানে গিয়েছি, যদি উল্টো অভিযোগের শিকার হতে হয়, তাহলে দরকার নাই (যাওয়ার)। আমি ছাত্রদের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি। আমি মনে করি, শুধু আমার হলের নয়, যেকোনো হলের শিক্ষার্থীদের বিপদে আমার যাওয়া উচিৎ।”

তিনি বলেন, “আমি সেখানে (ঘটনাস্থল) যাওয়া থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত স্যারের (প্রক্টর) সাথে কথা বলছি। আমি জানি, ঘটনার পরবর্তী সময়ে যে কেউ এটা নিয়ে ঝামেলা বাধাতে পারে। এজন্য প্রত্যেকটা কাজ প্রশাসনকে জানিয়ে করেছি। বিষয়টির সমাধান করতে গিয়েছিলাম, অন্য কিছু নয়।”

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. এ কে এম গোলাম রব্বানী বলেন, “ঘটনা শোনার পরই প্রক্টরিয়াল টিম সেখানে গিয়েছে। দুই পক্ষের মধ্যে কথা হয়েছে। অভিযুক্ত তার দোষ স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা করেছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের কাজ করবে না মর্মে লিখিত দিয়েছে।”

এই জুস কর্নারের মালিক সাইদ ও ফখরুল দুই ভাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী।