ঢাকা বৃহঃস্পতিবার, ২০শে জুন ২০১৯, ৬ই আষাঢ় ১৪২৬


আসছে বাজেট: দুশ্চিন্তায় সীমিত আয়ের মানুষ


৯ জুন ২০১৯ ০৯:১৭

আপডেট:
২০ জুন ২০১৯ ০১:৩২

চার বছরে বাজেটের আকার প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরের আড়াই লাখ কোটি টাকার বাজেট এবার হচ্ছে প্রায় সোয়া পাঁচ লাখ কোটি। এই সময়ে মূল্যস্ফীতির কারণে সীমিত আয়ের ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমলেও করমুক্ত আয়সীমা এক টাকাও বাড়েনি। আগামী ২০১৯-২০ অর্থবছরেও করমুক্ত আয়সীমা বাড়ছে না বলে রাজস্ব কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন।

অর্থাৎ, বছরে যাদের আয়ের পরিমাণ ন্যূনতম আড়াই লাখ টাকার বেশি হবে তাদের সবাইকে আয়কর দিতে হবে। অথচ নতুন ভ্যাট আইন কার্যকর হলে বিভিন্ন পণ্যের ওপর নতুন করে ভ্যাট বসবে, পণ্যের ট্যারিফ ভ্যালু প্রথা উঠে যাওয়ার কারণেই পণ্যমূল্য বাড়বে। করমুক্ত আয়সীমার মতোই অপরিবর্তিত থাকছে ন্যূনতম করহারও।

অর্থাৎ, আড়াই লাখ টাকার পর পরবর্তী চার লাখ টাকা পর্যন্ত আগের মতোই ১০ শতাংশ হারে আয়কর দিতে হবে। এ অবস্থায় করমুক্ত আয়সীমা না বাড়লে নির্ধারিত আয়ের মানুষদের সংসার চালাতে আরও হিমশিম খেতে হবে।

পাশের দেশ ভারতের নাগরিকদের করমুক্ত আয়সীমা মুদ্রামান বিবেচনায় বাংলাদেশিদের চেয়ে বেশি। দেশটির নাগরিকদের আড়াই লাখ রুপি পর্যন্ত আয়ের ওপর কোনো কর দিতে হয় না, বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৩ লাখ ৫ হাজার টাকা। আড়াই লাখ রুপির পর থেকে পরবর্তী পাঁচ লাখ রুপি পর্যন্ত ৫ শতাংশ হারে আয়কর দিতে হয়। বাংলাদেশে আড়াই লাখ টাকার পর থেকে পরবর্তী চার লাখ টাকা পর্যন্ত ১০ শতাংশ হারে করারোপ করা আছে, যা আগামী অর্থবছরও অব্যাহত থাকবে। যদিও এক্ষেত্রে কার্যকরী করহার ৬ দশমিক ১৫।

ব্যবসায়ীদের চাপের মুখে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) অব্যাহতির সীমা ৩০ লাখ থেকে বাড়িয়ে ৫০ লাখ টাকা করা হচ্ছে। অর্থাৎ, যেসব ব্যবসায়ী বছরে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত পণ্য বিক্রি করবেন, তাদের কোনো ভ্যাট দিতে হবে না। ফলে পাড়া-মহল্লার ছোট ব্যবসায়ীদের ভ্যাট দিতে হবে না। বার্ষিক লেনদেনের সীমা ৮০ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ কোটি টাকা করা হচ্ছে। তবে তাদের করের হার ৩ শতাংশ থেকে ১ শতাংশ বাড়িয়ে ৪ শতাংশ করা হচ্ছে। ফলে ৩ কোটি টাকার বেশি যাদের লেনদেন রয়েছে তাদের ১ শতাংশ বেশি হারে ভ্যাট দিতে হবে। সাধারণত বড় ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানগুলোরই ৩ কোটি টাকার বেশি লেনদেন রয়েছে।

নতুন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বিভিন্ন সময় বলে আসছেন যে, এতদিন যারা কর দিয়েছেন তাদের কম কর দিতে হবে। আর যারা দেননি তাদেরও দিতে হবে। তার এ বক্তব্যের পর সংশ্লিষ্টদের ধারণা হয়েছিল যে, করমুক্ত আয়সীমা বাড়তে পারে, কমতে পারে করের ন্যূনতম হার। তবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, করমুক্ত আয়সীমা ও ন্যূনতম করহারে কোনো

পরিবর্তন আসছে না।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি ও সাবেক বাণিজ্য সচিব গোলাম রহমান

বলেন, গত চার বছর ধরে জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেড়েছে। সেটি বিবেচনায় নিলে করমুক্ত আয়সীমা অবশ্যই বাড়ানো যৌক্তিক। অনেক উন্নত দেশ আছে, যারা করমুক্ত আয়সীমা নির্ধারণ করে রেখেছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়লেও সে সীমা বাড়ায় না। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট তেমন নয়। পাশের দেশ ভারতও মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় নিয়ে করমুক্ত আয়সীমা বাড়িয়ে থাকে। গত চার বছরের মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশেও এটি বাড়ানো যৌক্তিক।

চার বছর আগে, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে করমুক্ত আয়সীমা আড়াই লাখ টাকা নির্ধারণ করেছিলেন তখনকার অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্রের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেছিলেন, দেশটিতে করমুক্ত আয়সীমায় কোনো পরিবর্তন আনা হয় না। বাংলাদেশেও হবে না। যদিও এর আগে প্রায় প্রতি বছরই করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো হয়েছে। ২০১১-১২ অর্থবছরে করমুক্ত আয়সীমা ছিল ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা, পরের অর্থবছর তা বাড়িয়ে ২ লাখ টাকা করা হয়। আর ২০১৩-১৪ অর্থবছরে তা আরও বাড়িয়ে ২ লাখ ২০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়।

গত চার বছর ধরে মূল্যস্ফীতির তথ্য তুলে ধরে ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনগুলো প্রাক-বাজেট আলোচনায় করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর প্রস্তাব করে আসছে। আগামী অর্থবছরের বাজেটে করমুক্ত আয়সীমা বাড়িয়ে সাড়ে ৩ লাখ টাকা করার প্রস্তাব দেয় ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই। সংগঠনটির প্রস্তাবে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলা হয়, গত চার বছরে মূল্যস্ফীতির কারণে করদাতাদের জীবনযাত্রার মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের ওপর করভার কমানো, দেশ থেকে টাকা পাচারের প্রবণতা কমানো ও করদাতাদের সঠিক আয়কর প্রদর্শনে উৎসাহিত করতে ব্যক্তিগত করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো দরকার। সংগঠনটি ন্যূনতম স্তরে কার্যকরী করহার বিদ্যমান ৬ দশমিক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ দশমিক ৬৩ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করেছে।

সংগঠনটির সদ্য সাবেক সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, গত চার বছর ধরে করমুক্ত আয়সীমা বাড়েনি। অথচ এই সময়ে প্রতি বছর গড়ে ৫ শতাংশেরও বেশি মূল্যস্ফীতি হয়েছে। অর্থাৎ, আগে আড়াই লাখ টাকা আয়ের মানুষের যে ক্রয়ক্ষমতা ছিল এখন তা নেই। এ পরিপ্রেক্ষিতেই আমরা করমুক্ত আয়সীমা সাড়ে ৩ লাখ টাকা করা যৌক্তিক বলে মনে করি। অর্থমন্ত্রী ছোট ব্যবসায়ীদের ভ্যাট থেকে রেহাই দিতে ভ্যাট অব্যাহতির সীমা বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। সেক্ষেত্রে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোও উচিত বলে মনে করি।

এনবিআর কর্মকর্তারা জানান, করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো হলে বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠী আয়করের আওতার বাইরে চলে যাবে। তাই সীমা বাড়ানোকে যৌক্তিক মনে করছে না সংস্থাটি। অবশ্য এ ধরনের করদাতার কাছ থেকে খুব সামান্য রাজস্ব আদায় হয়ে থাকে। বর্তমানে সবচেয়ে বেশি আয়কর আদায় হচ্ছে উৎসে কর খাতে, যা মোট আয়করের ৫৭-৬০ শতাংশ। এর পরের অবস্থানে আছে অগ্রিম আয়কর (এআইটি) ও করপোরেট কর।

এনবিআরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, অন্যান্য দেশের করমুক্ত আয়সীমা বিবেচনায় বাংলাদেশের করমুক্ত আয়সীমা যেটা আছে তা যৌক্তিক। এটি পরিবর্তন করার ক্ষেত্রে এনবিআরের নীতিগত সিদ্ধান্তের চেয়ে সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশনা অনুযায়ী বাজেটের যেসব বিষয় চূড়ান্ত করা হয়, করমুক্ত আয়সীমা নির্ধারণ করা তার একটি।