ঢাকা বৃহঃস্পতিবার, ২০শে জুন ২০১৯, ৬ই আষাঢ় ১৪২৬


ফের সক্রিয় বিদেশি জালিয়াত চক্র


৩ জুন ২০১৯ ১৩:০০

আপডেট:
২০ জুন ২০১৯ ০১:০৬

কিছুদিন বিরতি দিয়ে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে ব্যাংকের এটিএম বুথের টাকা লুটে জড়িত বিদেশি জালিয়াত চক্রের সদস্যরা।

রাজধানীর বিভিন্ন ব্যাংক থেকে লাখ লাখ টাকা তুলে নিয়ে গেছে তারা। তবে কী পরিমাণ টাকা খোয়া গেছে সে বিষয়ে হিসাব কষছেন ব্যাংকের কর্মকর্তারা। এর আগেও কয়েক দফায় দেশীয় ব্যাংক কর্মকর্তাদের যোগসাজশে বিদেশি জালিয়াত চক্র কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশে বিভিন্ন ব্যাংকের এটিএম বুথে অ্যান্টি স্কিমিং ডিভাইস স্থাপনের পর চক্রের তৎপরতা কম ছিল। সম্প্রতি তারা আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপে এসব তথ্য জানা গেছে।

কর্মকর্তারা জানান, সর্বশেষ গত শনিবার রাতে রাজধানীর পান্থপথ এলাকার একটি আবাসিক হোটেল থেকে জালিয়াত চক্রের সদস্য ইউক্রেনের ছয় নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে খিলগাঁও থানায় মামলা হয়েছে। গ্রেপ্তারদের জিজ্ঞাসাবাদ করছেন ডিবির খিলগাঁও জোনাল টিমের একাধিক কর্মকর্তা।

ডিবির খিলগাঁও জোনের অতিরিক্ত উপকমিশনার শাহিদুর রহমান রিপন বলেন, ‘গ্রেপ্তাররা রুশভাষী। বাংলা কিংবা ইংরেজি ভাষা বুঝতে পারছে না। তাই দোভাষীর সহায়তায় তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। কোন পদ্ধতিতে জালিয়াতি করে, কত টাকা উত্তোলন করেছে, তাদের সহযোগী হিসেবে এদেশীয় কোনো চক্র জড়িত আছে কি না জানতে চাওয়া হচ্ছে। তবে বেশিরভাগ প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে তারা।’ তিনি বলেন, ‘এই চক্রে জড়িত ইউক্রেনের আরও একজন নাগরিক রয়েছে। তাকে গ্রেপ্তারে ইমিগ্রেশন পুলিশকে অবহিত করা হয়েছে।’ মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, গ্রেপ্তারকৃতরা পান্থপথের ওলিও ড্রিম হ্যাভেন আবাসিক হোটেলে অবস্থান নিয়ে অভিনব কৌশলে রাজধানীর খিলগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকার এটিএম বুথ থেকে টাকা তুলে নিয়েছে।

কর্মকর্তারা জানান, প্রথম দফায় গত শুক্রবার রাজধানীর খিলগাঁও এলাকার ডাচ-বাংলা ব্যাংকের একটি বুথ থেকে দুই বিদেশি নাগরিক তিন লাখ টাকা তুলে নিয়ে যায়। চলে যাওয়ার সময় ভুল করে কিছু টাকা

বুথে ফেলে রেখে যায়। বিষয়টি বুথের নিরাপত্তারক্ষী ব্যাংক কর্মকর্তাদের জানালে তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে সিসি ক্যামেরা ফুটেজ দেখেন। সেখানে দুই বিদেশি নাগরিকের টাকা উত্তোলনের দৃশ্য দেখা গেলেও ব্যাংকের সার্ভারে এই টাকা উত্তোলনের কোনো হিসাব জমা পড়েনি। বিষয়টিতে সন্দেহ হলে বিভিন্ন বুথে নজরদারি বাড়ানো হয়। গত শনিবার আবারও ওই বিদেশি নাগরিকরা মুখোশ পরে একই বুথে টাকা উত্তোলন করতে যায়। বুথে বেশি সময় নেওয়ায় নিরাপত্তারক্ষী আশপাশের লোক জড়ো করে। বিষয়টি টের পেয়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে একজনকে আটক করা হয়। পরে তার দেওয়া তথ্যে হোটেল ওলিও ড্রিম হ্যাভেনে অভিযান চালিয়ে আরও পাঁচজনকে আটক করা হয়। গ্রেপ্তাররা হলেনÑ ভ্যালেনটাইন, ওলেগ, ডেনিস, নাজেরি, সার্গিও ও ভোলোবিহাইন।

ডিবির একাধিক কর্মকর্তা জানান, ইউক্রেন থেকে একসঙ্গে সাতজন এসেছিলেন। এদের মধ্যে ভিটালি অভিযানের বিষয়টি টের পেয়ে পালিয়ে যান। তিনি যেন দেশ ছেড়ে চলে যেতে না পারেন, সে বিষয়ে সব ইমিগ্রেশন পয়েন্টে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। ডাচ-বাংলা ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা জানান, তাদের বুথ থেকে মোট চার লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে জালিয়াত চক্রটি। তারা এমন প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে, যাতে ব্যাংকের সার্ভারে কোনো তথ্য যায়নি। ফলে এটিএম বুথ থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়া হলেও ব্যাংক কর্র্তৃপক্ষ কিছুই টের পায়নি।

জানতে চাইলে কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের সাইবার ক্রাইমের অতিরিক্ত উপকমিশনার নাজমুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রযুক্তি বিষয়ে দক্ষ বিদেশি প্রতারকরা বিভিন্ন কৌশলে ব্যাংকের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংক কর্মকর্তাদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।

সিটিটিসির একাধিক কর্মকর্তা জানান, ২০১৪ সাল থেকে এটিএম বুথে জালিয়াতির মাধ্যমে টাকা উত্তোলনের তথ্য পান তারা। এরপর ২০১৬ সালের বিভিন্ন সময়ে নাইজেরিয়া, চীন, জার্মানি ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায়। ২০১৬ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি সিটি ব্যাংকের আইটি শাখার তিন কর্মকর্তাসহ ইউক্রেনের নাগরিক থমাসকে গ্রেপ্তার করা হয়। এটিএম বুথে স্কিমিং ডিভাইস নামে একটি যন্ত্র বসিয়ে টাকা উত্তোলন করেছিল তারা। ২০১৭ সালের আগস্ট মাসের বিভিন্ন সময় ব্র্যাক ব্যাংকের একজন গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তুলে নিয়ে যায় একটি চক্র। একই বছরের ৩ আগস্ট চট্টগ্রামের জিপিও বুথ থেকে, ৪ ও ৫ আগস্ট রাজধানীর শ্যামলীর রিংরোড এলাকার স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের বুথ থেকে, ১৬-২০ জুলাই মিরপুর ইস্টার্ন ব্যাংকের বুথ থেকে টাকা খোয়া যায়। ২০১৭ সালের ১৪-১৫ মার্চ র‌্যাব রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে বিদেশি নাগরিকসহ ১১ জনকে গ্রেপ্তার করে। তাদের কাছে ২০০ এটিএম কার্ড, ১০০ খালি এটিএম কার্ড ও ৬টি কার্ড পাঞ্চমেশিন পাওয়া যায়।