ঢাকা বৃহঃস্পতিবার, ২০শে জুন ২০১৯, ৬ই আষাঢ় ১৪২৬


তারা আবার মাদকে,আতঙ্কে সাধারণ মানুষ


২৭ মে ২০১৯ ১২:৫১

আপডেট:
২০ জুন ২০১৯ ০১:০৫

ঢাকাসহ সারা দেশে মাদকবিরোধী অভিযানে যেন শিথিলতা দেখা দিয়েছে। এই সুযোগে এলাকায় ফিরছে তালিকাভুক্ত অনেক মাদক কারবারি। যারা প্রতিনিয়ত ভারত ও মিয়ানমার থেকে মাদকের চালান নিয়ে আসছে। আর তাদের হাত ধরে প্রকাশ্য চলছে মাদক কেনাবেচা। এ নিয়ে আতঙ্কে আছে সাধারণ মানুষ; কিছুটা উদ্বিগ্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও।

এজন্য এরই মধ্যে পুলিশ সদর দপ্তরে বৈঠক হয়েছে। তারপর সদর দপ্তর থেকে মাদকের বিরুদ্ধে আরও জোরালো অভিযান চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্তাব্যক্তিরা বলছেন, অভিযান চলছে। মাদক কারবারিদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। কেউ কেউ ‘ক্রসফায়ারে’ মারাও যাচ্ছে। এলাকায় ফিরলে কেউ নিস্তার পাবে না। ঈদের পর সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে মাদক কারবারিদের আস্তানা গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ১ বছর ধরে চলা মাদকবিরোধী অভিযানে দেড় লক্ষাধিক কারবারিকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব, পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরসহ অন্য সংস্থাগুলো। একই সময়ে র‌্যাব-পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে ৩৩৪ মাদক কারবারি। টানা অভিযানের মুখে প্রাণ বাঁচাতে ইয়াবার প্রধান রুট কক্সবাজারের টেকনাফের ১০২ জন ইয়াবা কারবারি পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। তারপরও ঠেকানো যাচ্ছে না ইয়াবার কারবার।

এ প্রসঙ্গে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে র‌্যাব মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ জানান, মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ঢাকাসহ সারা দেশে মাদকবিরোধী অভিযান চলছে। মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স দেখানো হচ্ছে। আগামীতে আর কঠোর অভিযান চালানো হবে। অভিযান শিথিল করা হয়নি। মাদক কারবারিরা এলাকায় ফিরলে কেউ নিস্তার পাবে না। দেশ থেকে মাদক নির্মূল করা হবেই। এ ব্যাপারে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া  বলেন, মাদক কারবারিরা পুলিশের হাত থেকে কিছুতেই রেহাই পাবে না। অভিযান চলছে। তবে কিছু তালিকাভুক্ত মাদক কারবারি এলাকায় আছে বলে আমরা তথ্য পেয়েছি। যারা ওইসব কারবারির তথ্য দেবেন তাদের পরিচয় গোপন রাখা হবে। তিনি বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের যুদ্ধ চলছে। এই যুদ্ধে আমরা জয়ী হবই। পুরনোদের পাশাপাশি নতুন কারবারিদেরও তালিকা আছে আমাদের কাছে। ঈদের পর সাঁড়াশি অভিযান চালানো হবে। মাদকের আস্তানাগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে।

র‌্যাব-পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছরের ৪ মে থেকে র‌্যাব-পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছে দেড় লক্ষাধিক মাদক কারবারি। যার মধ্যে গত বছরের ৩ মে থেকে চলতি বছরের ১ মে পর্যন্ত র‌্যাব গ্রেপ্তার করেছে ২৪ হাজার ৮৯৮ জনকে। পুলিশ গত বছরের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত ১ লাখ ৪০ হাজার ৭৮৮টি মামলায় ১ লাখ ৮৫ হাজার ৫৯৫ মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করেছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর গত বছরের মে মাস থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত ১৪ হাজার ৩০৭ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। এছাড়া বিজিবি, কোস্টগার্ড কয়েক হাজার ইয়াবা কারবারিকে গ্রেপ্তার করেছে। গত বছরের ৩ মে থেকে চলতি বছরের ১ মে পর্যন্ত শুধু র‌্যাবই উদ্ধার করেছে ৬০৪ কোটি ৮৪ লাখ

টাকার মাদকদ্রব্য। চলতি বছর বিমানবন্দরে ইয়াবার ৫টি বড় চালান ধরা পড়েছে। ইয়াবার জন্য পাকস্থলী ভাড়াও যেন কারবারিদের কৌশলের অংশ হয়ে উঠেছে। সর্বশেষ পাকস্থলীতে ইয়াবা বহন করতে গিয়ে মৃত্যু হয় জুলহাস নামে এক যুবকের। গত ২৭ এপ্রিল তার মরদেহের ময়নাতদন্ত করতে গিয়ে পেটের মধ্যে ১১ প্যাকেটে ১৫০০ পিস ইয়াবা পান চিকিৎসকরা।

মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যানুযায়ী, গত বছরের ১৫ মে থেকে চলতি বছরের ২০ মে পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে ৩৩৪ মাদক কারবারি। এর মধ্যে ১১১ জন র‌্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা গেছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা  বলেন, আগের চেয়ে মাদকবিরোধী অভিযানে কিছুটা শিথিলতা চলছে। এই সুযোগে মাদক কারবারিরা এলাকায় আসছে বলে আমাদের কাছে তথ্য এসেছে। এতে আমরা কিছুটা হলেও উদ্বিগ্ন। অভিযান কিন্তু থেমে নেই। আগের চেয়ে আরও জোরালো অভিযান চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইজিপির নির্দেশে মাদক নির্মূল করা হবেই। ঈদের পর জোরালো অভিযান চালানো হবে। তিনি বলেন, গত মাসেও বেশ কয়েকটি জেলায় মাদক কারবারিরা আত্মসমর্পণ করতে চেয়েছিল। কিন্তু সময়ের কারণে তা সম্ভব হয়নি। যেকোনো সময় ওই আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান হবে বলে আশা করছি।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মাদক ব্যবসা ও সেবন প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে বাইরে চলে গেছে। যুব সমাজ ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে। সরকারের নির্দেশে পুলিশ-র‌্যাবসহ সবকটি গোয়েন্দা সংস্থা মাদক কারবারি ও গডফাদারদের তালিকা তৈরি করেছে। তালিকায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, জনপ্রতিনিধিসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশায় যুক্ত ‘হাইপ্রোফাইল’ লোকদের নাম রয়েছে।

তালিকাটি নিয়ে পুলিশ ও র‌্যাব বিশেষ অভিযান শুরু করে। কিন্তু বেশিরভাগ জেলায়ই তালিকাভুক্তরা ছিলেন আত্মগোপনে। আবার পুলিশের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, মাদক কারবারিদের সব ধরনের সহযোগিতা করছে পুলিশেরই কতিপয় সদস্য। সীমান্ত এলাকার থানাগুলোর পুলিশ সদস্যরাই মাদক কারবারে বেশি জড়িয়ে পড়ছে। গত ১৬ ফেব্রুয়ারি টেকনাফে ১০২ মাদক কারবারির আত্মসমর্পণের পর কিছুদিন মাদক কারবার প্রায় বন্ধই ছিল। এই সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানও শিথিল করা হয়। আর এই সুযোগে কক্সবাজার ও টেকনাফের মতো সারা দেশেই তালিকাভুক্ত কারবারিরা এলাকায় ফিরে এসেছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ বি এম মাসুদ হোসেন  বলেন, অভিযান কিন্তু বন্ধ নেই। গতকালও ঢাকার হাজারীবাগ থেকে আসা একই পরিবারের ৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা এলাকা থেকে নিয়মিত মাদক নিয়ে যায়।

নতুন নতুন মাদক কারবারিও গজিয়ে উঠছে। রোহিঙ্গারা এ ব্যবসা চালাচ্ছে। তিনি বলেন, টেকনাফ ও কক্সবাজার থেকে মাদক নির্মূল করতে যা যা করার দরকার তাই করা হবে। যেসব কারবারি আত্মসমর্পণ করছে আশা করি তারা সঠিক পথে থাকবে। এখনো যারা এসব কারবার চালাচ্ছে তাদের তালিকার কাজ শুরু হয়েছে। আমাদের কাছে তথ্য আছে, তালিকাভুক্তদের অনেকে এলাকায় আসা-যাওয়া করছে। তাদের ধরার চেষ্টা চলছে। ঈদের পর আরও জোরালো অভিযান চালানো হবে।

কুমিল্লার পুলিশ সুপার নুরুল ইসলাম  বলেন, তালিকাভুক্ত মাদক কারবারিদের মধ্যে অনেকে গ্রেপ্তার হয়েছে। আবার কেউ কেউ পালিয়ে আছে। আমাদের কাছে তথ্য এসেছে, তালিকাভুক্তদের মধ্যে কেউ কেউ এলাকায় আসা-যাওয়া করে। তাদের ধরার চেষ্টা চলছে। মাদক নির্মূল করতে যা যা করা দরকার সবই করা হবে। অভিযান চালাতে গিয়ে মাঝে মধ্যে কারবারিদের সঙ্গে সংঘর্ষ হচ্ছে। এতে কারবারিরা মারাও যাচ্ছে। ঈদের পর আরও কঠোর অভিযান চালানো হবে।

নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার হারুন অর রশীদ  বলেন, এলাকা থেকে মাদক কারবার শেষ করতে পুলিশ আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে। পুরনোদের পাশাপাশি নতুন মাদক কারবারিদের তালিকা করা হচ্ছে। ঈদের পর আরও জোরালো অভিযান চালানো হবে। যেসব তালিকাভুক্ত কারবারি এলাকায় চলাফেরা করছে তাদের আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরও কয়েকটি জেলার পুলিশ সুপার বলেন, রোজার কারণে অভিযান অনেক কম হচ্ছে। তার আগেও অভিযান কিছুটা শিথিল ছিল। গত বছরের তুলনায় মাদকবিরোধী অভিযান অনেক কম। আর এর সুযোগ নিচ্ছে মাদক কারবারিরা। শহরের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলেও মাদক কেনাবেচা হচ্ছে।

তালিকাভুক্তরা এলাকায় আছে। কিছু রাজনৈতিক নেতা তাদের সহায়তা করছে বলে আমরা তথ্য পাচ্ছি। পুলিশ সদর দপ্তরকে বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে। ঈদের পর আরও জোরালো অভিযান শুরু হবে। তালিকাও হালনাগাদ করা হচ্ছে।

পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, কিছুদিন আগে বিভিন্ন জেলা থেকে পুলিশ সদর দপ্তরে প্রতিবেদন পাঠানো হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, যেসব মাদক কারবারি আত্মগোপনে ছিল তাদের অনেকেই এলাকায় ফিরেছে। তারা প্রকাশ্যে মাদক কেনাবেচা করছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর সম্প্রতি পুলিশ সদর দপ্তরে বৈঠক হয়। বৈঠকে আইজিপিসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে অংশ নেওয়া এক কর্মকর্তা বলেন, বৈঠকে ঈদের পর সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে মাদকের আস্তানাগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়ার, নতুন কারবারিদের তালিকা করার, অভিযান কেন আগের মতো হচ্ছে না তা অনুসন্ধান করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার, অভিযানগুলোর ফলোআপ পুলিশ ও র‌্যাব সদর দপ্তরের মনিটরিং করার এবং নতুন করে কেউ আত্মসমর্পণ করতে চাইলে তাকে সে সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

শীর্ষ মাদক কারবারিদের মধ্যে যারা এলাকায় এসেছে বলে পুলিশ-র‌্যাবের কাছে তথ্য এসেছে তাদের মধ্যে আছেÑ কক্সবাজারের রামুর মোস্তাক মেম্বার, নুরুল মেম্বার, টেকনাফের শাহজাহান, শরীয়তপুর জাজিরার বিকেনগর জসীম হাওলাদার, ফেনীর জসিম মিয়া, নুর আহমেদ, মোহাম্মদ নবী, কামাল মিয়া সুমন, কুমিল্লার মোহাম্মদ মসিন, শাহজালাল মিয়া, চট্টগ্রামের কাশিম আহমেদ, মুরাদ উদ্দিন, সুনামগঞ্জের মোহাম্মদ করিম, আবদুল জলিল, আলী হোসাইন, পাভেল মিয়া, মঞ্জুরুল হক, কাশিম মিয়া, ময়মনসিংহের আবুল হাসান, চুয়াডাঙ্গার হান্নান শেখ, মিথুন, সাফিকুল, সাগর শেখ, রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাঁশবাড়ি এলাকার সখিনা, বিউটি, সুরাইয়া ওরফে লিপি, সোহেল, জেনেভা ক্যাম্পের আসাদ, মোকছেদ, শাকিল, রিজিয়া, আসাদ, মোকছেদ, শাকিল, বছিলার নাছরিন, লতা বেগম, সুফিয়া, নসু মিয়া, শেখেরটেকের স্বপন মিয়া, জসিম ওরফে কানা জসিম, আগারগাঁও বিএনপি বস্তির আফরোজা আক্তার হাসি, ফাতেমা, নুরজাহান আবুল হোসেন লিটন, শামসুানাহার, রনি, কবির হোসেন, জাকির, স্বপন, মেরুল বাড্ডার ডিআইটি প্রজক্টের জয়নাল, রহিম, বাদশা, সবুজ, রুহুল আমিন, ফেন্সি জয়নাল, মোল্লাপাড়ার আদর্শনগরে সাইফুল, জুলহাস, আতাউর রহমান কালু, রাসেল, সোহাগ মির্জা, শাহজাহানপুরের শামীম, কালাচাঁদপুরে লোটন, বনানীর বরকত, মহাখালী টিভি গেট এলাকায় হান্নান, বাবু, সাতরাস্তার আবু সাঈদ, রবিউল ইসলাম, ধলপুর সিটি পল্লীর তসলিম, কবির, মাস্টার, আসলাম ও দীন ইসলাম, মুন্সীবাড়ির পারুল ও মিরাজ, ধনিয়া গোয়ালবাড়ির আক্তার, নদী, বাবুল, নাদিম, মিজান, পুলিশের সোর্স কবির, বেগম, পারুলী, মনোয়ারা, ছাফি, মুরগি টগর, তামান্না, ময়ুরী, স্বপ্না, বেবী, মিরপুর ঝিলপাড় বস্তির নজরুল ওরফে নজু, মিল্লাত ক্যাম্পের রুস্তম, মিরপুর মাজার রোডের রাজা প্রমুখ।