ঢাকা মঙ্গলবার, ২০শে আগস্ট ২০১৯, ৬ই ভাদ্র ১৪২৬


কলহের কেন্দ্রে ৬০,উসকানির অভিযোগ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে!


১৫ মে ২০১৯ ১২:৪০

আপডেট:
২০ আগস্ট ২০১৯ ১৪:১৫

ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণার পর যে ক্ষোভ-বিক্ষোভ দেখা দিয়েছে তার মূলেই রয়েছে ‘ষাট’। ছাত্রলীগের নতুন কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্ত কয়েকজন নেতা গতকাল মঙ্গলবার  এ কথা জানিয়ে বলেন, ষাটেই লেগেছে জট; ষাটেই দেখা দিয়েছে ক্ষোভ।

এর ব্যাখ্যায় তারা জানান, সংগঠনের ‘সাবেক নেতাদের সিন্ডিকেটের’ মাত্র ৬০ জনকে নেতা বানানোর বিষয়টি ইস্যু করা হয়েছে।

যেখানে ওই সিন্ডিকেট চাইছিল ৩০১ জনের কমিটির মধ্যে তাদের অনুগতই ১৫০ জনকে রাখতে। তাই নতুন কমিটির বিরুদ্ধে প্রতিবাদে নেমেছে সাবেক ছাত্রলীগ নেতাদের অনুসারীরা।

সাবেক নেতাদের ওই সিন্ডিকেটের ইন্ধনে নতুন কমিটির বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছেন নতুন কমিটিতে পদ পাওয়া নেতারাও, যারা পদত্যাগ করার হুমকিও দিচ্ছেন। এই দলে আছেন অল্প কয়েকজন ত্যাগী নেতাও।

ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটির শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন নেতা বলেন, ছাত্রলীগের সাবেক নেতারা তাদের ‘চাহিদামতো ভাগ’ না পাওয়ায় পদবঞ্চিতদের ইন্ধন দিয়ে নতুন কমিটির বিরুদ্ধে মাঠে নামিয়েছেন কিছু ছাত্রলীগ কর্মীকে। নতুন কমিটির বিরুদ্ধে আন্দোলন যারা করছেন তাদের অনেকেই নতুন কমিটিতে আছেন। তবুও তাদের কয়েকজন আন্দোলন করছেন ‘অবমূল্যায়নের’ অভিযোগ তুলে। এ বিষয়টি বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায়, তাদের উদ্দেশ্য খারাপ।

আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাত্রলীগের কমিটি অনুমোদন দিয়েছেন; তার পরও আপনারা কেন আন্দোলন করছেন জানতে চাইলে শামসুন্নাহার হলের ছাত্রলীগের সভাপতি নিপু তন্বী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর নাম বিক্রি করে বিভিন্ন কর্মকাণ্ড করা হয়েছে।

ছাত্রলীগ বড় একটি সংগঠন। কেউ পদ পাবে, কেউ পদ পাবে না এটা স্বাভাবিক। কিন্তু আমরা যারা নিয়মতান্ত্রিকভাবে কথা বলতে গিয়েছি, তখন পদপ্রাপ্তরা আমাদের ওপর হামলা করেছে।

আমি বিশ্বাস করি, এমন নেতাকর্মীদের প্রধানমন্ত্রী অনুমোদন দেবেন না। এ ছাড়া আমরা দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতি করেছি। কিন্তু হঠাৎ করে অল্প কয়েক দিন ধরে রাজনীতি করেছে তাদের বড় পদ দেওয়া হয়েছে। আর আমাকে দেওয়া হয়েছে উপসাংস্কৃতিক সম্পাদক। যোগ্যদের মূল্যায়ন করা হয়নি।’

 

ছাত্রলীগের সাবেক ও বর্তমান কমিটির কয়েকজন নেতার সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ৩০১ সদস্যের হলেও মাত্র ২৩ জন নারী নেতা হয়েছেন। জেলা পর্যায়ের নেতা কেন্দ্রীয় কমিটিতে জায়গা পাননি বললেই চলে।

বিভিন্ন জেলা থেকে যারা নেতা হয়েছেন তাদের বেশিরভাগই ঢাকায় রাজনীতি করার স্বীকৃতি পেয়েছেন কেন্দ্রীয় কমিটিতে জায়গা পেয়ে। সনাতন ধর্মাবলম্বী বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ পদ পেলেও আদিবাসী গোষ্ঠীর মাত্র দুজন কেন্দ্রীয় কমিটিতে স্থান পেয়েছেন। আন্দোলন বিক্ষোভ হলে এসব ইস্যুতে হওয়া উচিত ছিল।

যারা আন্দোলন করছেন, পদত্যাগের হুমকি দিচ্ছেন তারা এসব ইস্যুতে কিছুই বলছেন না। বেশ কিছু বিবাহিত ছাত্রলীগের নেতা হয়েছেন, বয়স না থাকলেও নেতা হয়েছেন। আর চাকরিজীবী এবং মামলার আসামিরাও আছেন কমিটিতে। অথচ এসব নিয়ে কোনো প্রতিবাদ নেই কারও।

ছাত্রলীগের নতুন কমিটির তিন সদস্য  বলেন, সাবেক চারজন সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক প্রায় ১৫০ জনের একটি নামের তালিকা ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর হাতে দেয়।

ওই চার নেতা গত কমিটির সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসেনের মাধ্যমে তালিকাটি দেয়। সাবেক নেতাদের এই সিন্ডিকেটের দাবি ছিল, তাদের দেওয়া তালিকার সবাইকে নেতা বানানোর।

সেখানে কাকে কোন পদ দিতে হবে তাও উল্লেখ করে দেওয়া হয় তালিকায়। ছাত্রলীগের বর্তমান নেতৃত্ব সেই তালিকা থেকে ৬০ জনকে নেতা বানালেও তাদের পছন্দমতো পদ দেওয়া হয়নি কাউকেই। মূলত এতেই ক্ষিপ্ত ছাত্রলীগের সাবেক নেতারা। আর ইন্ধনে কমিটি ঘোষণার পরপরই মাঠে নামিয়ে দেওয়া হয় পদবঞ্চিতদের। যেখানে পদবঞ্চিত নেতা হিসেবে যারা আন্দোলনে রয়েছেন তাদের সবাই আগের কমিটির সভাপতি সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক জাকিরের অনুসারী হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পরিচিত।

ছাত্রলীগের সম্পাদক পদ পাওয়া এক সদস্য  বলেন, সাবেক ওই নেতাদের হয়ে পদবঞ্চিতদের বিক্ষোভে শক্তি জোগাচ্ছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ও ডাকসুর এজিএস সাদ্দাম হোসেন। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘কমিটির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ কেন হচ্ছে তা কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে জিজ্ঞেস করুন।’ তিনি বলেন, ‘আমি এ সম্পর্কে কিছুই বলতে পারব না।

’ এ বিষয়ে জানতে গত কমিটির সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসেনের সঙ্গে কথা বলার জন্য তাদের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে চেষ্টা করেও সাড়া পাওয়া যায়নি।

ছাত্রলীগের শীর্ষ পর্যায়ের আরেক নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ছাত্রলীগ নিয়ে সব সময়ই ভাগাভাগির খেলা চলে। ছাত্রলীগের সাবেক নেতারা ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারাও এই ভাগাভাগিতে থাকেন। তাদের ভাগ দিতে গিয়ে অনেক সক্রিয় কর্মীকে পদ দেওয়া যায় না। ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি নির্ভুলভাবে করাও কষ্টকর হয়ে পড়ে।

তা ছাড়া ছাত্রলীগের কমিটি হয়েছে ৩০১ সদস্যের। সক্রিয় রাজনীতি করে লাখ লাখ ছাত্র। এখান থেকে নেতা বানানোর কাজে হিমশিম খেতে হয়। ফলে কমিটি হওয়ার পরে সব সময়ই প্রতিবাদ হয়। তবে এবারের ঘটনা অনাকাক্সিক্ষত।

ছাত্রলীগের নতুন কমিটিতে সম্পাদক পদে পেয়েছেন, এমন একজন  বলেন, ৩০১ সদস্যের কমিটিতে গত কমিটির রয়েছে ১৩৩ জন, সাবেক নেতাদের তালিকা থেকে পদ দেওয়া হয়েছে ৬০ জনকে এবং আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের পছন্দে পদ দেওয়া হয়েছে ৪২ জনকে। সব মিলিয়ে ২৩৫ জনকে এভাবে নিতে হয়েছে। বাকি ৬৬ জন বর্তমান সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের পছন্দে হয়েছে। দেখা গেছে, নিজেদের বিশ্বস্তদেরই কমিটিতে রাখতে পারেননি তারা।