ঢাকা মঙ্গলবার, ২০শে আগস্ট ২০১৯, ৬ই ভাদ্র ১৪২৬


হৃদয়কে ঢাবিতে ভর্তি না করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ’


৭ নভেম্বর ২০১৮ ০৫:১৮

আপডেট:
৭ নভেম্বর ২০১৮ ০৫:১৯

 মায়ের কোলে চড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেন ‘সেরিব্রাল পালসি’তে আক্রান্ত হৃদয় সরকার

ঢাকা: মায়ের কোলে চড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেন ‘সেরিব্রাল পালসি’তে আক্রান্ত হৃদয় সরকার। সরকারিভাবেও প্রতিবন্ধী হিসেবে স্বীকৃতি রয়েছে তার। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী, শ্রবণ, বাক ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীর বাইরে অন্য কোনো ধরনের প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর জন্য কোটা না থাকায় ঢাবিতে ভর্তির সুযোগ পাওয়া অন্য প্রতিবন্ধীদের তুলনায় মেধাক্রমে এগিয়ে থেকেও ভর্তির সুযোগ পাননি হৃদয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাষ্ট্র ‘সেরিব্রাল পালসি’কে প্রতিবন্ধিতা হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রীয় সে আইন মানতে বাধ্য। তা না করলে সেটা হবে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। হৃদয়কে ভর্তি না করার অধিকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কে দিয়েছে— এমন প্রশ্নও তারা তুলছেন। তারা বলছেন, যে আইন বা ব্যবস্থা সঠিকভাবে একজন প্রতিবন্ধীকে চিহ্নিত করতে পারে না, সে আইন-ব্যবস্থা নিজেই প্রতিবন্ধী।

 

ঢাবি ভর্তি পরীক্ষা, মায়ের কোলে চড়ে পরীক্ষা, হৃদয় সরকার, ‘খ’ ইউনিট ভর্তি পরীক্ষা,
সোমবার (৫ নভেম্বর) দুপুরে ঢাবি কলা অনুষদে ‘খ’ ইউনিটে উত্তীর্ণ ওয়ার্ড, খেলোয়াড় ও প্রতিবন্ধী কোটাধারীদের মনোনয়ন সংগ্রহের জন্য ডাকা হয়। প্রতিবন্ধী হিসেবে ডাকা হয় ৯ জনকে। এর মধ্যে ৪৫৮৪ মেধাক্রমেও রয়েছেন একজন। কিন্তু ৩৭৪০ মেধাক্রমে থেকেও হৃদয় সরকার মনোনয়ন সংগ্রহের ডাক পাননি। অথচ হৃদয় হাঁটতে পারেন না ছোটবেলা থেকেই। তার হাতের সব আঙুলও কাজ করে না। সমাজসেবা অধিদফতর থেকেও তাকে ‘সেরিব্রালপালসি’ প্রতিবন্ধী উল্লেখ করে একটি আইডি কার্ড দেওয়া হয়েছে।

রাষ্ট্রীয়ভাবেও ‘সেরিব্রাল পালসি’কে প্রতিবন্ধিতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩’তে। এতে বলা হয়েছে, অপরিণত মস্তিষ্কে কোনো আঘাত বা রোগের আক্রমণের কারণে যদি কোনো ব্যক্তির সাধারণ চলাফেরা ও দেহভঙ্গিতে অস্বাভাবিকতার ফলে দৈনন্দিন কার্যক্রমকে সীমাবদ্ধ হয় কিংবা তার মস্তিষ্কের ক্ষতিগ্রস্ততার পরিমাণ পরবর্তী সময়ে কমে যায় বা না বাড়ে এবং উপযুক্ত স্বাস্থ্যসেবার মাধ্যমে তার দৈনন্দিন কর্মক্ষমতা বাড়ানো যায়, তাহলে ওই ব্যক্তি ‘সেরিব্রাল পালসিজনিত প্রতিবন্ধী ব্যক্তি’ বলে বিবেচিত হবেন।

অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী দৃষ্টি, শ্রবণ বা বাকপ্রতিবন্ধী নন বলে কোটা সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন হৃদয় সরকার। এ নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই হতাশ তিনি। হৃদয় দৈনিক আমাদের দিনকে বলেন, আমার কোটার কাগজপত্র আছে। কিন্তু ঢাবিতে নাকি আমার কোটা নাই! এটা কোন নিয়মের মধ্যে পড়ল, আমি বুঝলাম না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সেন্টার ফর ল অ্যন্ড পলিসি অ্যাফেয়ার্সের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট সৈয়দ মাহবুবুল আলম দৈনিক আমাদের দিনকে বলেন, আইনে সেরিব্রাল পালসিকে একক প্রতিবন্ধিতা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কী করে কেবল দৃষ্টি, শ্রবণ ও বাকপ্রতিবন্ধীর জন্য কোটা রাখে?

সৈয়দ মাহবুবুল আলম দৈনিক আমাদের দিনকে বলেন, রাষ্ট্র আইন করেছে, সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেগুলেশনে কী আছে, সেটা দেখলে হবে না। রাষ্ট্র যখন আইন করে দেয়, তখন সেটা রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান, প্রতিটি সংস্থা ও প্রতিটি মানুষের জন্য প্রযোজ্য। সেখানে কোনো প্রতিষ্ঠানের রেগুলেশন কার্যকর করার কোনো সুযোগ নেই।

সৈয়দ মাহবুবুল আলম দৈনিক আমাদের দিনকে আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবন্ধিতার কয়টি ক্রাইটেরিয়া রয়েছে, সে অনুযায়ী তো প্রতিবন্ধী নির্ধারণ হবে না, প্রতিবন্ধী নির্ধারণ হবে রাষ্ট্রীয় আইনে। রাষ্ট্র হৃদয়কে প্রতিবন্ধী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। রাষ্ট্র বলেছে, প্রতিবন্ধীদের শিক্ষার সমান সুযোগ দিতে হবে। সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইন মানতে বাধ্য।

সেরিব্রাল পালসিকে কেন প্রতিবন্ধিতা হিসেবে গ্রহণ করা হবে— জানতে চাইলে চিকিৎসক ও সমাজকর্মী ডা. লেলিন চৌধুরী দৈনিক আমাদের দিনকে বলেন, সেরিব্রাল পালসিতে মস্তিষ্কের ভেতরের একটি অংশ সম্পূর্ণভাবে কাজ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। একজন প্রতিবন্ধী হচ্ছেন সেই মানুষ, যার অসুস্থতা কখনোই পরিপূর্ণ নিরাময় করা সম্ভব নয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মে সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত হৃদয় প্রতিবন্ধী কোটার জন্য বিবেচিত হয়নি— এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ডা. লেলিন দৈনিক আমাদের দিনকে বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ১৯২১ সালে। সে সময়ের আইনে এ বিষয়টি না থাকতে পারে। কিন্তু বর্তমান সময়কে মোকাবিলা করার জন্য এবং এ সময়ের সমস্যা সমাধানের জন্য তাদের আইনকে সময়োপযোগী করা দরকার।

হৃদয়কে ভর্তি না করার অধিকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কে দিয়েছে— এমন প্রশ্ন রেখে ডা. লেলিন বলেন, একজন অটিস্টিক মানুষ বা তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ কি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারবে না? তাহলে রাষ্ট্রীয় মূলমন্ত্র ‘প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার’ বা ‘সবার জন্য সমান শিক্ষা’— এ মূলমন্ত্র কি ঢাবি মানছে না?

জানতে চাইলে জাতীয় প্রতিবন্ধী ফোরামের সাবেক পরিচালক ও ডিজ্যাবিলিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কনসালট্যান্ট ডা. নাফিসুর রহমান দৈনিক আমাদের দিনকে বলেন, সেরিব্রাল পালসিকে এককভাবে আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী যদি শারীরিক প্রতিবন্ধীদের জন্য তাদের কোটা না থাকে, তাহলে ভর্তি পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের লিখে দেওয়া উচিত— ‘শারীরিক প্রতিবন্ধীদের জন্য আমাদের কোটা নেই’। কিন্তু শারীরিক প্রতিবন্ধীদের জন্য কোটা থাকবে না— এ কথা তো তারা বলেনি।

হৃদয় সরকারের ঘটনায় ক্ষোভ জানিয়ে ডা. নাফিসুর বলেন, ‘একজন প্রতিবন্ধী ছেলে আবেদন করল, পরীক্ষা দিয়ে পাস করল। কোয়ালিফাই করার পরে তারা বলছে, সে ভর্তির জন্য সুযোগ পাবে না। এটা হতে পারে না, বিশ্ববিদ্যালয় এটা করতে পারে না।’

‘টাইপ অব ডিজঅ্যাবিলিটি’র কারণে হৃদয় সরকারের সঙ্গে বৈষম্য করা হচ্ছে উল্লেখ করে ডা. নাফিসুর বলেন, কেবল প্রতিবন্ধিতা নয়, তার বিশেষ প্রতিবন্ধিতার জন্য তার সঙ্গে বৈষম্য করা হচ্ছে। এর ভিত্তিতে বৈষম্য করলে সেটা অপরাধ হবে, সে বৈষম্যের শাস্তির বিধানও রয়েছে আইনে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো দেশের অন্যতম সেরা একটি উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এ ধরনের নিয়ম প্রত্যাশিত নয় উল্লেখ করে ডা. নাফিসুর বলেন, এই বিশ্ববিদ্যালয় তো বিভিন্ন আন্দোলনের সূতিকারগার। বিভিন্ন ধরনের অসঙ্গতি দূর করে এসেছে ঢাবি। এখান থেকে সারাদেশ শিক্ষা গ্রহণ করে, কী করতে হবে। সেখানে ২০১৮ সালে এসে এই প্রতিষ্ঠান এমন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে না। আর করলেও প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সুরক্ষা অধিকার আইন অনুযায়ী এটি একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

 


‘কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিবন্ধিতার ভিত্তিতে বৈষম্য করতে পারবে না— আইনের ধারায় এ কথা বলা হয়েছে। এই কথাটি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে মনে করিয়ে দিতে চাই,’— বলেন ডা. নাফিসুর রহমান।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাবি কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আবু মো. দেলোয়ার হোসেন দৈনিক আমাদের দিনকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শর্তের মধ্যে বাক, শ্রবণ ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীর জন্য কোট বরাদ্দ আছে। হৃদয় সেই শর্তের মধ্যে পড়ে না। যদি এ ধরনের প্রতিবন্ধীর জন্য কোটা চালু হয়, তখন তারা নিশ্চয় ভর্তি হতে পারবে।

সমাজসেবা অধিদফতর প্রতিবন্ধী হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও কেন ঢাবি ভর্তি পরীক্ষায় হৃদয় বা তার মতো প্রতিবন্ধীদের জন্য কোটা প্রযোজ্য হবে না— জানতে চাইলে ঢাবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামান কোনো উত্তর দেননি।