ঢাকা মঙ্গলবার, ২৮শে জানুয়ারী ২০২০, ১৬ই মাঘ ১৪২৬


ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দিকে তাকিয়ে কাজ করছে দুদক


১০ ডিসেম্বর ২০১৯ ১৩:২৮

আপডেট:
২৮ জানুয়ারী ২০২০ ০৯:২৯

দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের পড়াশোনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগে। পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক নীতি বিশ্লেষণ ও উন্নয়নে বিশেষায়ণসহ অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস থেকে নীতি অধ্যয়নে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পিএইচডি সম্পন্ন করেন লোকপ্রশাসনে। ১৯৮১ সালে যোগ দেন সিভিল সার্ভিসে। ছিলেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব। সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, যোগাযোগ ও রেলপথ মন্ত্রণালয় এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে। আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার তার রয়েছে বিস্তৃত অভিজ্ঞতা। আন্তর্জাতিক দুর্নীতি বিরোধী দিবস সামনে রেখে দুর্নীতি দমন প্রচেষ্টায় কাজের অভিজ্ঞতা, ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম, ঘুষ প্রতিরোধ, প্রকল্পে দুর্নীতি, নৈতিকতা-মূল্যবোধের জাগরণ, ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনাসহ বিভিন্ন বিষয়ে সম্প্রতি তার সঙ্গে কথা হয় ।


সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এম এম মুসা ও জেসমিন মলি

দুদকের চেয়ারম্যান হিসেবে চার বছরের সময়কালে আপনার কাজের অভিজ্ঞতা কেমন?

কাজের অভিজ্ঞতা পুরোপুরি সুখকর নয়; আবার একেবারে হতাশাজনক, তা-ও না। মাঝামাঝি একটা অবস্থা। তবে সত্য হলো, গত চার বছরে আমাদের নিরন্তর প্রচেষ্টা ছিল। মূলত দমনের চেয়ে দুর্নীতি প্রতিরোধের প্রচেষ্টা বেশি ছিল। হাতেনাতে ঘুষ ধরার সংখ্যা বেড়েছে। এটি একটি প্রতিরোধের কাজ হয়েছে। অভিজ্ঞতা থেকে আরেকটি বিষয় মনে হয়েছে, আমাদের প্রজন্মের মানসিকতা পরিবর্তন করা খুবই কঠিন। আশা করি, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে মানসিকতার পরিবর্তন আসবে। এসডিজিতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এসডিজির প্রায় লক্ষ্যমাত্রাই তাদের লক্ষ্য করে নির্ধারণ করা হয়েছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দিকে তাকিয়েই আমরা প্রতিরোধের কাজটি করছি এবং কাজটি বেশ জোরালোভাবে করছি। আমরা সেখানে সম্পদও বেশি বিনিয়োগ করছি। কাজেই আমাদের অভীষ্ট গোষ্ঠী (টার্গেট গ্রুপ) হলো পঞ্চম থেকে দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থীরা। তাদের আমরা যদি এখন মূল্যবোধ, নৈতিকতার কিছুটা ছোঁয়া দিতে পারি, তাদের মানসপটে যদি সুশিক্ষার বীজ বপন করতে পারি; তাহলে পাঁচ-দশ বছর পর কিংবা ২০৩০ সালের পর যারা দেশের দায়িত্ব নেবে, সেই প্রজন্মকে আমরা একটি নৈতিকতার আবহে রাখতে পারব। তারা সুনাগরিক, সুকর্মকর্তা এবং সুব্যবসায়ী হিসেবে নিজস্ব পরিসর থেকেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি অবস্থান নেবে। এটি আমাদের এক ধরনের দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি ও অবস্থান বলতে পারেন। সুতরাং সে ব্যাপারে আমরা কাজ করছি।

জানেন যে, আনুমানিক ২৮ হাজার স্কুলে সততা সংঘ গড়ে তুলেছি, প্রায় চার হাজার স্কুলে সততা স্টোর চালু করেছি। এগুলো মূলত চর্চা করার জন্য। তারা যাতে সততার চর্চা করে, রচনা প্রতিযোগিতা করে, বিতর্ক প্রতিযোগিতা করে, দুর্নীতিবিরোধী ও মূল্যবোধসংশ্লিষ্ট সাংস্কৃতিক আয়োজন করে, সেই ব্যবস্থা করে চলেছি। আমরা সেজন্য অর্থও দিয়েছি। আমরা আশা করছি, মানুষকে যদি প্রণোদিত করা যায়, মনের মধ্যে ছাপ ফেলা যায়, তাহলে দুর্নীতির মাত্রা কমবে।

আরেকটি বিষয়, আমরা রোল মডেল তৈরির চেষ্টা করছি। সমাজে যত বেশি ভালো রোল মডেল পাব, শিশুরা তাদেরই অনুসরণ করবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সাংবাদিকতা, ব্যবসা, আমলাতন্ত্র, রাজনীতিসহ সব ক্ষেত্রেই রোল মডেলের সংখ্যা বাড়াতে হবে। সবক্ষেত্রেই কিন্তু আমাদের ভালো লোক আছে। বিতর্কিত নয় এমন লোক সবখানেই কম-বেশি পাবেন। কিন্তু সংখ্যাটা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নয়। আমরা চাইছি আপনাদের (গণমাধ্যম) বা আলাপচারিতার মাধ্যমে মানুষকে বোঝাতে। একজন উচ্চপদস্থ কোনো লোককে যদি আমরা আইন আওতায় আনি, তখন তিনি বুঝতে পারেন যে কাজটি ভালো করেননি। পুরো পরিবার, আত্মীয়-স্বজন এবং সমাজ-সংসারে তার একটি প্রভাব পড়ে। এবং সেটি অনেক লজ্জার। এ লজ্জাটাই কিন্তু এক ধরনের নিবৃত্তি (ডিটারেন্ট) হিসেবে কাজ করে। আপনি তো সব দুর্নীতিবাজ ধরতে পারবেন না, এটি সম্ভব নয়। বিশ্বের কোথাও হয়নি। কাজেই আমরা হয়তো ডেমোনস্ট্রেটিভ কিছু করি। আপনি যদি একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে শাস্তি নিশ্চিত করতে পারেন, তাহলে সমাজে একটি ডেমোনস্ট্রেটিভ ইফেক্ট পড়ে।

 

ব্যাংকিং খাতের অনেক অনিয়ম দুদক অনুসন্ধান, তদন্ত করেছে। আপনাদের গৃহীত প্রচেষ্টার প্রভাব আর্থিক খাতে পড়েছে?

প্রভাব অবশ্যই আছে। সরকারের আন্তরিকতা আমরা দেখতে পাচ্ছি। সেটি দেখেই আমরা ব্যাংকিং খাতের অনিয়মে হস্তক্ষেপ করেছি। একটি কথা স্পষ্ট করে বলতে চাই এবং আমি চাই যে আপনাদের মাধ্যমে সবাই জানুক, একটি ভুল বোঝাবুঝি রয়ে গেছে যে, আমরা বোধ হয় ঋণের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করি। ঋণ দেয়ার বিষয়ে আমরা কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করি না। আমি বারবার বলেছি, ব্যাংক নিজস্ব নিয়মনীতি, ব্যাংকিং রীতি মেনে ঋণ দেবে। তাতে আমরা কোনো হস্তক্ষেপ করি না। আমরা চাই, ঋণ দেয়া হোক। কারণ ব্যাংকঋণ না দিলে ক্ষুদ্র, মাঝারি বা বড় ব্যবসায়ীরা ব্যবসা কীভাবে করবেন। ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে যথাযথ প্রক্রিয়া যদি আপনি না মানেন, যদি ঠিকানাবিহীন কাউকে ঋণ দেন, যদি ভুয়া কাগজপত্রের ভিত্তিতে ঋণ দেন, সেগুলো নজরে এলে তবেই কিন্তু আমরা ব্যাংকিং খাতে হস্তক্ষেপ করি। না হলে নয়। আমরা সরকারকে অনুরোধ করেছিলাম, ব্যাংকিং খাত সংস্কারের আওতায় আনা দরকার। ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদকে পুনর্গঠন, পুনর্বিন্যাস করা দরকার। সরকার তা করেছে। সেটি করা হয়েছে বলেই কিছু ব্যাংকিং অনিয়ম খতিয়ে দেখতে পেরেছি। ফলে কিছুটা সঠিক ধারায় এসেছে। হয়তো ব্যাংকগুলো এখনো পুরোপুরি নিজস্ব নীতি ও চর্চা অনুযায়ী চালিত হয়নি। তবে একটি বিষয় দৃশ্যমান, অনিয়ম করে ঋণ দেয়াটা হয়তো কিছুটা কমেছে। কমে যাওয়ার কিছু কারণ আছে। এক. অনেকেই যথাযথ কাগজপত্র (ডকুমেন্ট) দিতে পারে না; দুই. যারা ঋণ পাচ্ছেন না, তারা আসলে ভালো ব্যবসায়ী নন। কিন্তু যারা সত্যিকার অর্থেই ভালো ব্যবসায়ী, ব্যাংকের অর্থ ফেরত দেয়ার মানসিকতাসম্পন্ন সৎ ব্যবসায়ীদের ঋণ পেতে অসুবিধা হচ্ছে না। গবেষণা করলে দেখবেন, প্রতিষ্ঠিত বা সৎ ব্যবসায়ীদের ঋণ পেতে কোনো ঝামেলা হচ্ছে না, অসুবিধা হচ্ছে না। যদি অসুবিধা হয় আমাদের কাছে আসুক, আমরা সুবিধা করে দেব। আমরা সহায়তা করব। আমাদের একটি কাজ হলো সহায়তা করা। মূলত সমস্যা হচ্ছে তাদেরই, যারা মনে করে যে ব্যাংকের টাকা নিলে ফেরত দিতে হবে না; যার কারণে খেলাপি ঋণ বেড়েছে। এটাও ঠিক অনেকে বলেন, দুদক কেন খেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না। খেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দায়িত্ব আমাদের নয়। ওই খেলাপি ঋণের মধ্যে যদি কেউ ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে ঋণ নিয়ে থাকে, সেখানে আমাদের দায়িত্ব আছে। কিন্তু সাধারণভাবে কোনো ব্যবসায়ী যৌক্তিক কারণে (দুর্যোগ, ফলন মার যাওয়া, ব্যবসায় লোকসান) খেলাপি হলে সেক্ষেত্রে আমরা কোনো হস্তক্ষেপ করি না।

 

সাম্প্রতিক সময়ে বড় প্রকল্পে বিভিন্ন দুর্নীতির ঘটনা সামনে এসেছে। এক্ষেত্রে দুদকের তো বড় ধরনের দায়িত্ব রয়েছে—

আমরা সে দায়িত্ব পালন করছি। বালিশকাণ্ড কিংবা অন্যান্য দুর্নীতির ঘটনাগুলো আমরা তদন্ত করছি। মামলা এগিয়ে যাচ্ছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে তথ্য ঘাটতিও রয়েছে। যেমন, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে একটা তথ্য বের হয়েছিল। সেখানে কিন্তু আমরা দেখতে পেয়েছি, ওই প্রজেক্ট এখনো পাস হয়নি। যদিও প্রকল্পের প্রোফাইলে বিষয়গুলো উল্লেখ রয়েছে। তাছাড়া প্রকল্পে এ ধরনের বিষয় উল্লেখ থাকাটা কোনোভাবেই সংগত না। একটা বালিশের দাম ১০ হাজার টাকা—প্রকল্প প্রোফাইলে এমন বিষয় লিখে রাখাটা অনৈতিক। আমার ধারণা, পরিকল্পনা কমিশনে ওই প্রকল্পের প্রোফাইল গেলেই বিষয়গুলো ধরা পড়ত। তবে এটি আগেই প্রকাশ হওয়ায় অনেক ভালো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তর বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত হয়েছে এবং পরবর্তী সময়ে তারা যথাযথ ব্যবস্থা নিয়েছে। সবদিক মিলিয়ে আমি বলব সাংবাদিকদের কাজগুলো বেশ দৃশ্যমান। আমরাও তাদের কাছ থেকে অনেক ধরনের তথ্য পাই।

 

জনগণের একটি বড় হতাশা হলো বাজারের ব্যর্থতা। পেঁয়াজ কিংবা চাল নিয়ে সাম্প্রতিক সময় আমরা যে বিষয়গুলো দেখছি—এ জায়গাগুলোয় দুদকের কাজের কোনো ক্ষেত্র রয়েছে কিনা?

এ জায়গাগুলোয় দুদকের কাজের ক্ষেত্র নেই, আবার আছেও। যেমন পেঁয়াজ আমদানি করে নিয়ে আসার পর দাম হলো ৬০ টাকা। এ অবস্থায় ব্যবসায়ী তো লাভ রাখবে। কিন্তু লাভের পরিমাণ যদি অত্যধিক বেশি হয়, তবে তা অবৈধ সম্পদ হয়ে যায়। যেকোনো ব্যবসার, যেকোনো কাজের নৈতিকতার একটি মানদণ্ড থাকতে হবে। আইন করে নৈতিকতার মানদণ্ড তৈরি করা যায় না। এটা ব্যক্তির নিজের। যেকোনো জায়গায় গিয়ে বিষয়গুলো দেখার পর আমরা কিন্তু বুঝতে পারি যে মানদণ্ডটা কী হওয়া উচিত। সেই মানদণ্ডের পরিধির বাইরে গেলেই কাজগুলো অবৈধ হয় বলে দুদক মনে করে। সে হিসেবে বাজারের এ বিষয়গুলোয় আমরা হস্তক্ষেপ করি না। কেননা বাজারশক্তিই পণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসবে। আমাদের দেশে অনেক সময় বাজারে দুর্নীতি হয়। কিন্তু এটা যেহেতু আমাদের আওতাভুক্ত নয়, তাই আমরা হস্তক্ষেপ করিনি। তবে সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়া, যেমন ধান, চাল ক্রয়—এ বিষয়গুলোয় আমরা হস্তক্ষেপ করেছি। বেসরকারি খাতগুলোয় আমাদের তেমন কিছু করার নেই। বিশেষ করে যতক্ষণ পর্যন্ত না আমরা দেখি যে ওই ব্যবসায়িক প্রক্রিয়ার অবৈধ সম্পদ অর্জন হচ্ছে। যদি এটা হয়, সেক্ষেত্রে আমরা আলাদাভাবে ওই বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করি। পরিশেষে এতটুকু বলতে চাই, গত চার বছরে আর কিছু হোক না হোক, আমরা মানুষের কাছে একটা বার্তা দিতে পেরেছি যে দুদক নামে একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। অন্যায় করলে যারা আজ না হোক কাল কিংবা পরবর্তী সময়ে আপনাকে জবাবদিহির কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে। আমি এখানে ঠিক ‘ভীতি’ কিংবা ‘আতঙ্ক’ শব্দটি ব্যবহার করতে চাই না, তবে আমি এখানে ‘সচেতনতা’ শব্দটি ব্যবহার করব। আমি বলব দুর্নীতির বিরুদ্ধে মানুষের মধ্যে এক ধরনের সচেতনতা তৈরি করা গেছে। সচেতনতা তৈরি করা গেছে দুর্নীতিবাজদের মধ্যেও। এছাড়া সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে দুর্নীতিবিরোধী বার্তা পৌঁছে দেয়া সম্ভব হয়েছে যে দুর্নীতি সম্পর্কে সচেতন হতে হবে।

দায়িত্ব গ্রহণের পর আপনার প্রত্যাশা অনুযায়ী সরকারের কাছ থেকে পূর্ণাঙ্গ সহযোগিতাপ্রাপ্তি সম্পর্কে জানতে চাই?

আমার প্রত্যাশা ছিল সরকারের কাছ থেকে পূর্ণাঙ্গ সহযোগিতা পাব এবং তা পেয়েছি। গত চার বছর সরকারের পক্ষ থেকে সহযোগিতা ও সমর্থনের কোনো কমতি ছিল না। এক্ষেত্রে আমি পরিপূর্ণ সন্তুষ্ট। দ্বিতীয়ত, দায়িত্ব গ্রহণের পর আমি দেখলাম যে শুধু সরকারি সমর্থন দিয়েই দুর্নীতি প্রতিরোধ বা দমন করা সম্ভব নয়। গত চার বছরের অভিজ্ঞতায় আমার মনে হয়েছে, এক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর একটা বড় ধরনের সমর্থন প্রয়োজন। কেবল সরকারের সমর্থন নিয়ে দুর্নীতির করাল গ্রাস থেকে আমরা জাতিকে মুক্ত করতে পারব না। সব রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন, সুশীল সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষার্থী, সব পেশাজীবী সংগঠন সর্বোপরি জনসাধারণের পূর্ণাঙ্গ সমর্থন প্রয়োজন। চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে এসে দেখলাম, বিশেষ করে এক বছর কাজ করার পর বিষয়টি বুঝতে পারলাম যে শুধু সরকারের সমর্থনে দুর্নীতি দূর হবে না, এক্ষেত্রে সম্মিলিত সমর্থন প্রয়োজন।

আমরা সাংবাদিকদের সমর্থন পেয়েছি—এটা আমাকে দ্ব্যর্থহীনভাবে বলতে হবে। সাংবাদিকরা সমালোচনা করেছেন—এটা আমাদের কাজে লেগেছে। আমাদের কাজটাকে আমরা সমালোচনার আদলে গুছিয়ে নিতে পেরেছি। সংবাদকর্মীরা অনেক সময় তথ্য দিয়ে সাহায্য করেছেন। এর মাধ্যমে আমরা উপকৃত হয়েছি। আপনাদের দেয়া অনেক তথ্যের ভিত্তিতে মামলা হচ্ছে। তবে প্রতিষ্ঠান হিসেবে যে মাত্রায় জনগণের আস্থা অর্জন করা সমীচীন ছিল, আমাদের কাজের মাধ্যমে তা করতে সমর্থ হইনি। যদিও এর অনেক ব্যাখ্যা আমি দিতে পারব। তবে বিষয়টি স্বীকার করতে হবে। যদিও সেই অর্থে জনগণের সমর্থনও আমরা পাইনি। যদিও জনগণের কাছ থেকে সমর্থন না পাওয়ার দায়টিও আমাদের। এক্ষেত্রে আমরা আংশিক ব্যর্থ হয়েছি। তবে আমি কিন্তু ঢালাওভাবে বলছি না জনগণের সমর্থন নেই। কেননা কিছু কিছু ক্ষেত্রে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনগণ সোচ্চার হয়েছে।

আপনার গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো সম্পর্কে জানতে চাই...

কেবল বাহবা পাওয়ার জন্য আমাদের স্বল্পমেয়াদি কোনো কাজ করা উচিত নয়। আমাদের বরং দূরদৃষ্টিসম্পন্ন হতে হবে। আজ আমি দায়িত্বে রয়েছি, কিছুদিন পর হয়তো থাকব না। তাই আমাদের এমন সব কাজ করা উচিত, দীর্ঘমেয়াদে যার প্রভাব থাকবে এবং কাজগুলো মানুষের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে। এ পর্যায়ে আমার মেয়াদকালে আমি দুদকের সিস্টেম ডেভেলপের বিষয়টি উল্লেখ করব। অনেক সময় দেখা যায়, আমরা হয়তো দেশের বাইরে অবস্থান করছি। যোগাযোগের কারণে কাজ সম্পাদনে ব্যাঘাত ঘটে। বিষয়টির সমাধানে বাইরে থেকেও আমরা যাতে পরস্পরের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে কাজগুলো করতে পারি, সে বিষয়ক ব্যবস্থা উন্নয়ন করা হয়েছে। এ বিষয়টির প্রভাব অনেক দিন থাকবে বলেই আমার ধারণা। দ্বিতীয়ত, তরুণদের জন্য গঠিত দুর্নীতিবিরোধী মঞ্চ ‘সততা সংঘ’। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে সততা, নৈতিকতা ও মূল্যবোধকে গ্রোথিত করার মানসে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সংগঠন গঠনের এ কাজও দীর্ঘদিন থাকবে বলে আমি বিশ্বাস করি। বাংলাদেশে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর কাজ হচ্ছে—আন্তর্জাতিক পরিসরে বিষয়টি কিন্তু অনেক গুরুত্ব পেয়েছে। এছাড়া আমরা গণশুনানির ব্যবস্থা করেছি, সরকারি কর্মকর্তারা সরাসরি সাধারণ জনগণের কথা শুনছেন, জনগণ তাদের সমস্যা সম্পর্কে বলতে পারছে। এর মাধ্যমে জনগণের কাছে আমাদের জবাবদিহিতার বিষয়ও নিশ্চিত হয়। আমরা জনগণের জন্য কাজ করি। আমাদের কাজ জনগণের জন্য সেবা নিশ্চিত করা, সরকারের সেবাগুলো জনগণের কাছে পৌঁছে দেয়া। আর তা আমাদের একটা বিধিবদ্ধ আইন-কানুনের মধ্য দিয়ে করতে হবে। আমরা চাইছি প্রক্রিয়াগুলো অব্যাহত রাখতে। প্রক্রিয়াগত কোনো ত্রুটির জন্য যেন জনগণ সেবা পাওয়া থেকে বিরত না হন, নিগৃহীত না হন, তারা যাতে অবহেলার পাত্র না হন, তা নিশ্চিত করতে হবে। জনগণের পূর্ণ সেবা নিশ্চিতের জন্য আমরা কাজ করছি।

শ্রুতলিখন: হুমায়ুন কবির ও রুহিনা ফেরদৌস

আলোকচিত্রী: সোহেল আহমেদ