ঢাকা বৃহঃস্পতিবার, ২০শে ফেব্রুয়ারি ২০২০, ৯ই ফাল্গুন ১৪২৬


ভুল পথে সর্বনাশ ব্যাংকের


১৬ জানুয়ারী ২০২০ ০১:০১

আপডেট:
১৬ জানুয়ারী ২০২০ ০১:০১

আর্থিক খাতে মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান ব্যাংক। গ্রাহকের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে আরেক গ্রাহককে ঋণ দেয় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। ব্যাংকের মূলত স্বল্পমেয়াদে ঋণ দেওয়ার কথা।

আর দীর্ঘমেয়াদি ঋণের জোগানদাতা পুঁজিবাজার, বিশেষ তহবিল বা ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান। কিন্তু বাংলাদেশে ব্যাংকের দখলে সবই। পুঁজিবাজারের দুর্বলতা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সক্ষমতা অর্জন না করায় স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি তহবিলের একমাত্র উৎস এখন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো।

স্বল্পমেয়াদে আমানত সংগ্রহ করে দীর্ঘমেয়াদে ঋণ দেওয়ার ফলে বিপদ বাড়ছে ব্যাংক খাতের। এ ছাড়া ব্যাংক পরিচালনার দায়িত্বে থাকা কেউ কেউ খুব সহজেই অনিয়মের মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা দীর্ঘ সময়ের জন্য ব্যাংক খাত থেকে বের করে নিয়ে যাচ্ছেন।

প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মের বাইরে গিয়ে পরিচালনার ক্ষেত্রে লাভবান হচ্ছেন ব্যাংকের প্রভাবশালী মালিকরা।

ব্যাংকের ভুলপথে যাওয়ার কারণে গুটিকয়েক লোক সুবিধা পেলেও গোটা অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়ছে। একদিকে পুঁজিবাজার বিকশিত হতে পারছে না, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো দাঁড়াতে পারছে না। অন্যদিকে ঋণের নামে অর্থ আত্মসাতের মচ্ছব পড়েছে ব্যাংক খাতে।

দেশে ব্যাংকের সংখ্যা ৫৯টি। আরও ৩টির অনুমোদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। সারাদেশে ব্যাংকের শাখা ১০ হাজার ৪০৬টি। ব্যাংকগুলোতে আমানতের পরিমাণ ১২ লাখ ১৯ হাজার কোটি টাকা। সংগৃহীত আমানত থেকে ঋণ দেওয়া হয়েছে ৯ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা।

ব্যাংক খাতের দক্ষতার ওপর নির্ভর করে অর্থনীতির সক্ষমতা। অথচ অর্থনীতির মেরুদ- ব্যাংক খাতের অবস্থা মোটেই ভালো নেই। ঋণের নামে চলছে অর্থ লুটপাট। মূলধন হারিয়ে বন্ধের উপক্রম কোনো কোনো ব্যাংক। পাহাড়সম খেলাপি ঋণে জর্জরিত। অর্থ নিয়ে কারবার করেও তীব্র অর্থ সংকটে ভুগছে ব্যাংক খাত। সরকারের শীর্ষপর্যায়ের কর্মকর্তারাও এ খাত নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন। ঘোষণা দিয়ে ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোর চেষ্টা চলছে। কিন্তু সব চেষ্টাই যেন ভেস্তে যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ব্যাংকের সংকটের মূলে রয়েছে তার ভুলপথে যাত্রা। সংকট সমাধান করতে হলে যে উদ্দেশ্যে ব্যাংকের সৃষ্টি, সেই উদ্দেশ্যেই তাকে পরিচালনা করতে হবে। কিন্তু সেদিকে কেউ নজর দিচ্ছেন না। বিচ্ছিন্নভাবে নির্দিষ্ট সংকট সমাধানের চেষ্টা হচ্ছে। এতে সংকট দূর হচ্ছে না বরং ঘনীভূত হচ্ছে।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ব্যাংক খাতে নানা সংকট রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম খেলাপি ঋণ, আমানত কমে যাওয়া ও সুদহার বৃদ্ধির চাপ। এসব সংকট ঠিক করতে হলে সবার আগে

ব্যাংকের গোড়া ঠিক করতে হবে। ব্যাংকগুলো স্বল্পমেয়াদে আমানত নিয়ে স্বল্পমেয়াদে ঋণ দেবে। তারা ৩ থেকে ৫ বছর মেয়াদে আমানত নিচ্ছে। অথচ ঋণ দিচ্ছে ৫ থেকে ১৫ বছর মেয়াদে। এর ফলে তহবিল সংকটে পড়ছে। সংকট মেটাতে উচ্চসুদে আমানত সংগ্রহ করছে। এতে ঋণের সুদহারও বেড়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদে ঋণের জন্য পুঁজিবাজার ও বন্ড মার্কেট শক্তিশালী করতে হবে। তাহলে ব্যাংকের প্রতি চাপ কমবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং ব্যাংক বিশ্লেষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উদ্যোক্তাদের অর্থায়নের জন্য সব উৎসই বাংলাদেশে আছে। কিন্তু ব্যাংক ভিন্ন অন্য কোনো উৎস বিকশিত হতে পারেনি। এর পেছনে সরকারের যেমন দূরদর্শিতার অভাব রয়েছে তেমনি প্রভাবশালীদের কারসাজিও দায়ী।

ব্যাংকের প্রভাবশালী মালিক এবং প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতারা মিলে ব্যাংকগুলোকে তার মূল কাজ থেকে সরিয়ে এনেছেন। ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে ২০ থেকে ৩০ বছর মেয়াদ পর্যন্ত। প্রথমে ৫ থেকে ১০ বছর মেয়াদে ঋণ দিয়ে পরে এই মেয়াদ অব্যাহতভাবে বাড়ানো হচ্ছে। ব্যাংকের অর্থ ব্যবহারের মূল দায়িত্ব পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের হাতে। তারা ১০-১২ জন সদস্য এক বৈঠকে বসে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ অনুমোদন করতে পারছেন। এতে আইনগতভাবে তাদের আর কোনো জবাবদিহিতা নেই। ফলে কয়েকজন সদস্য এক হয়ে বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা ঋণ হিসেবে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে। এটি দীর্ঘ সময়ের জন্য। তাই এক ব্যাংকের মালিক অন্য ব্যাংকের মালিককে ঋণ দিচ্ছেনÑ এভাবে পারস্পরিক যোগসাজশের মাধ্যমে খুব সহজেই হাজার কোটি টাকা ব্যাংক থেকে তুলে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে।

অন্যদিকে ব্যাংকের তুলনায় পুঁজিবাজার থেকে ঋণ নেওয়া অনেক কঠিন। এখানে জবাবদিহিতা রয়েছে। পুঁজিবাজারে অন্তর্ভুক্ত হতে হলে বেশকিছু নিয়মনীতি পরিপালন করতে হয়। শেয়ারের ক্রেতা মূলত পুঁজিবাজারের ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা।

তাদের আকৃষ্ট করার মতো কোম্পানি গঠন ও পরিচালনার দক্ষতা দেখাতে হবে। ব্যবসা পরিচালনা করে সফল হয়ে বিনিয়োগকারীদের মুনাফা না দিতে পারলেও কেউ শেয়ার কিনতে বা ধরে রাখতে চাইবে না।

কিন্তু এসবের কোনো কিছুই নেই ব্যাংক ঋণের ক্ষেত্রে। একবার অর্থ নেওয়ার পর সেটি ফেরত দেওয়ার এখতিয়ার ঋণগ্রহীতার। ফেরত না দিলে পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীর মতো ব্যাংক নিজের দেওয়া ঋণ অন্য কারোর কাছে বিক্রি করতে পারবে না।

খেলাপি হয়ে গেলেও ঋণগ্রহীতার কাছে আটকে থাকে ব্যাংক। ব্যাংকের ঋণখেলাপি বেশি হলে সেটি ওই ব্যাংকের জন্য দুর্নাম।

তাই নিজের দুর্নাম ঘুচাতে ঋণের টাকা আদায় করতে না পেরে বাধ্য হয়ে ব্যাংক ঋণগ্রহীতাকে পুনঃতফসিল, সুদ মওকুফসহ নানা ধরনের সুবিধা দিয়ে থাকে। ব্যাংক থেকে সহজে অর্থ পাওয়ার সুবিধাই পুঁজিবাজারের গড়ে ওঠার পথে প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজেও ব্যাংকগুলোকে সংকটের পথে ঠেলে দিচ্ছে। খেলাপিদের পুনঃতফসিল সুবিধা দিতে ১০ বছর বা ১২ বছর পর্যন্ত ঋণের মেয়াদ বাড়িয়ে নীতিমালা তৈরি করা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ নীতিমালা পরিপালন করতে গিয়ে দীর্ঘদিনের জন্য অর্থ আটকে যাচ্ছে। আবার ঋণের বিপরীতে প্রভিশনও রাখতে হচ্ছে দীর্ঘ সময়ের জন্য।

ইসলামিক ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের (আইএফআইএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু জাফর মো. সালেহ বলেন, অর্থায়নের জন্য দুটি খাত রয়েছে।

একটি মানি মার্কেটÑ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এবং অন্যটি পুঁজিবাজার। ব্যাংকগুলো স্বল্পমেয়াদে আমানত সংগ্রহ করে দীর্ঘমেয়াদে ঋণ দিয়ে তারল্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে সংকটে পড়ছে।

এতে ব্যাংক নিজেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সংকট সমাধানে উপায় হচ্ছে ব্যাংক স্বল্পমেয়াদে ঋণ দেবে, আর্থিক প্রতিষ্ঠান দীর্ঘমেয়াদে এবং আরও বেশি দীর্ঘমেয়াদে অর্থায়ন করবে পুঁজিবাজার। সরকারিসহ বড় বড় প্রকল্পগুলো বন্ড ইস্যু করে অর্থ সংগ্রহ করতে পারে। তাহলে সব খাতই ক্রিয়াশীল হবে। দেশের অর্থনীতি দ্রুত এগিয়ে যাবে। এই বিষয়ে নীতিনির্ধারকরা সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

বর্তমানে ব্যাংক খাতের মূল সংকট খেলাপি ঋণ। চলতি অর্থবছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা। বিশেষ ছাড়, পুনঃতফসিল সুবিধা, খেলাপি নীতিমালা সহজ করার পরও খেলাপি ঋণ গত ৯ মাসে বেড়েছে সাড়ে ২২ হাজার কোটি টাকা।

খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির প্রধান কারণ ঋণের উচ্চ সুদহার। আরেকটি কারণ, জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ তুলে দেওয়া। ঋণের সুদহার বৃদ্ধির কারণ হচ্ছে আমানত সুদহার বেশি থাকা।

ব্যাংকের মালিকরা সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ সুদে আমানত সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করলেও সেটিতে সফল হননি। আগ্রাসীভাবে দীর্ঘমেয়াদে বিপুল পরিমাণ ঋণ দেওয়ার কারণে তহবিল সংকট সৃষ্টি হয়েছে।

সংকট কাটাতে উচ্চ সুদে আমানত সংগ্রহ করছে ব্যাংকগুলো। কিন্তু ব্যাংকগুলো যদি স্বল্পমেয়াদে আমানত সংগ্রহ করে স্বল্পমেয়াদে ঋণ দিত তাহলে তহবিল সংকট হতো না, সুদহার বাড়ত না, খেলাপিও কম হতো।

বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) প্রেসিডেন্ট ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, বেশি সুদে ঋণ নিয়ে অনেক সময় ব্যবসায়ীরা পরিশোধ করতে পারেন না। ফলে খেলাপি হয়ে যান।

সুদহার নির্ভর করে চাহিদা ও সরবরাহের ওপর। দীর্ঘমেয়াদের ঋণের চাহিদা থাকায় ব্যাংকগুলো দিয়ে দিয়েছে। কিন্তু আমানত এসেছে স্বল্পমেয়াদে। স্বাভাবিকভাবে তহবিলের সংকট হচ্ছে। এই তহবিল সংকট কাটানোর মূল পথ হচ্ছে ব্যাংকের যে কাজ স্বল্পমেয়াদে আমানত নিয়ে স্বল্পমেয়াদে ঋণ দেওয়া, সেটি করতে দিতে হবে। আর দীর্ঘমেয়াদে ঋণের জোগান দিতে পুঁজিবাজার ও বন্ড মার্কেট শক্তিশালী করতে হবে।

ব্যাংকের সংকটের অন্যতম আরেকটি কারণ একই পরিবারের হাতে অনেকগুলো ব্যাংক থাকা বা একই ব্যাংকে একই পরিবারের আধিপত্য বিস্তার। চট্টগ্রামভিত্তিক একটি গ্রুপেরই মালিকানাধীন ব্যাংক রয়েছে ৮টি। বেশ কয়েকটি ব্যাংক একেকটি পরিবারের নিয়ন্ত্রণে।

সরকারের পক্ষ থেকে ব্যাংকের সংকট সমাধানের নানা চেষ্টার কথা শোনা যাচ্ছে। কিন্তু প্রকৃত সমস্যা সমাধানে সরকার এখন পর্যন্ত কোনো উদ্যোগ নেয়নি। খেলাপি ঋণ, উচ্চ সুদহার, তহবিল সংকট ইত্যাদি সংকট সমাধানের জন্য ব্যাংকগুলোকে সঠিক ব্যাংকিং নীতি অনুসারে পরিচালনার ব্যবস্থা করা উচিত। একইসঙ্গে পুঁজিবাজার, বন্ড মার্কেট ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে শক্তিশালী করতে হবে। এ ছাড়া অবকাঠামোগত ও খাতভিত্তিক উন্নয়নে অর্থের জোগান দিতে বিশেষ তহবিলও গঠন করতে পারে সরকার।